অন্যের সন্তানদের চিকিৎসা বন্ধ করে দিলে যদি নিজের সন্তানদের খাওয়া-দাওয়া ও পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় ?

প্রকাশ: ১২ জুলাই, ২০১৮ ১১:৩১ : পূর্বাহ্ন

ডাঃ সৈয়দ আবদুর রহমান
দৈনিক সমকাল পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো’র খ্যাতিমান সাংবাদিক রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সের একমাত্র শিশু কন্যা রাইফার লাশের ছবি গত ৩০ জুন (১৮ইং) সবগুলো প্রেস ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করেছে বিশেষ অভিযোগ উল্লেখ করে।
অভিযোগট হলো, রাইফাকে গলাব্যথা নিয়ে নগরীর একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারের স্বেচ্ছাচারিতা,  ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে  শিশুটির  মৃত্যু হয়েছে বলে ডাক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন পিতা রুবেল খান।
এই অভিযোগে চকবাজার থানা পুলিশ অভিযুক্তদের আটক করে। কিন্তু চিকিৎসকদের সমিতি আইনি মোকাবেলা না করে অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে নেন এবং ডাক্তার সমিতির নেতা ডা.ফয়সাল ইকবাল আরো হুমকি দিয়ে বলেন-ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের সন্তানদেরকে চিকিৎসা দেয়া হবে না। এনিয়ে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
          ইতিমধ্যে এখানকার কয়েকটি ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতালে ম্যাজিস্টেট কর্তৃক অভিযান পরিচালিত হলে
তাতেও অনেক অনিয়ম ধরা পড়ে। এতে করে সকল বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে ৮ ও ৯জুলাই থেকে ধর্মঘটের ডাক দেন। পরে উপর মহলের আশ্বাসে তা প্রত্যাহার করে নেন।
এতে করে অনেক জটিল রোগীর চিকিৎসা সেবা ব্যহত হয়। এভাবে পক্ষে বিপক্ষে নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে বিভিন্ন মিডিয়ায়।
         ইতিপূর্বেও উক্ত ক্লিনিকে পাইলস রোগীর অপারেশন করে রোগীর পায়ুপথে ডাক্তার সাহেব সুঁই’টি রেখে দেন। অপারেশন পরবর্তী রোগী সু্স্থ হওয়ার বদলে জীবন সংকটাপন্ন হলে ভারতে গিয়ে সুঁই বের করে বাংলাদেশের আদালতে জমা দেন। আদালত উক্ত ডাক্তারকে জেলে দিলে চট্টগ্রামের চিকিৎসক সমিতি আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডেকে হাজার হাজার রোগীকে জিম্মি করে ডাক্তারকে জেল থেকে বের করে আনেন।
এধরনের ভুল চিকিৎসার অভিযোগ আরো অনেক ক্লিনিক ও ডাক্তারদের বিরুদ্ধে হরহামেশা উঠছে। পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে সংবাদ হচ্ছে। তারপর হইচই, তদন্ত কমিটি হয়। ফলাফল অভিযুক্ত ডাক্তার সাহেবরা হয়তো নির্দোষ হয়, নয়তো তদন্তের আর খবর নেই। উদ্বেগের বিষয় হল অভিযুক্ত ডাক্তার সাহেবরা তাদের ভুলত্রুটি তদন্ত করতে, ব্যাখ্যা বিশ্লেষন করতে কোন গবেষক বিশেষজ্ঞ কিংবা ম্যাজিস্ট্রেসির কর্তাব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করেন না বা করতে দেন না।
        কথা হল ডাক্তারদের এধরনের স্বেচ্ছাচারিতা তো আগে দেখা যেত না। বরং রোগী অসু্স্থ হলে ডাক্তার রোগীর বাসায় চিকিৎসা দিয়ে আসত।
এখন এধরনের স্বেচ্ছাচারিতার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হল বর্তমানে ডাক্তারী পেশাকে ব্যবসা ও জবাবদিহিতাবিহীন পেশা হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।
আশির দশক পর্যন্ত এদেশের চিকিৎসা পেশাতে এমবিবিএস ডাক্তারের পাশাপাশি প্যারামেডিকস, এলএমএফ,পল্লী চিকিৎসকদের বিচরণ ছিল। ফলে এমবিবিএস ডাক্তাররা রোগী পেতেন কম। তখন এমবিবিএস ডাক্তারগণ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য রোগীর বাড়ীতে চলে যেতেন চিকিৎসা সেবা দিতে।
নব্বই দশকের শুরুতে বিএমডিসি অাইন করে এদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্যারামেডিকস, এলএমএফ, পল্লী চিকিৎসকদের রোগীর চিকিৎসা করার আইনগত ভিত্তি সংকোচিত করে নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, এধরনের ডাক্তার পরিচয়ে চিকিৎসা করাতে নিরুৎসাহিত করার বিধান করা হয়েছে। তাই এধরনের ডাক্তারী জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিদের অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে এখন। ফলে মধ্যম মানের ডাক্তারী পড়ালেখা বন্ধ করে কিংবা একেবারে সংকোচিত করে, কর্মসংস্থান নিশ্চিহ্ন বা একেবারে সংকোচিত করে এমবিবিএস ডাক্তাররা চিকিৎসা পেশাতে একচেটিয়া আধিপত্য গড়ে তোলে।
এরপর নানা অজুহাতে রোগীর বাড়ী যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মূমূর্ষ রোগীকেও চেম্বারে এসে চিকিৎসা নিতে বাধ্য করছে।
        হাল আমলের সিরিয়াল প্রথা ডাক্তারদের কিংবদন্তীতুল্য অর্থ সম্মান যশ খ্যাতির চুড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। যারা ডাক্তারদের চেম্বারে যাতায়াত করেন তারা জানেন অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারদের চেয়ে সিরিয়াল দেওনেওয়ালার দাপট কত বিষাক্ত। সিরিয়াল ফিস গোপনী বা লেখা না হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ডাক্তার ভিজিট ফিসের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। কারণ, তারা সিরিয়াল আগ-পাছ করতে ‘স্পীড মানি’র উপর ডিপেন্ডেন্সির ভাষা মুখে না বললেও কাজে বুঝিয়ে দেন। এখন আবার সিরিয়ালের নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে যে চিকিৎসার দিন নির্দিষ্ট একটি সময়  ১০ বা ২০ মিনিটের মধ্যে রোগীকে ফোন করতে হবে এবং এতে যার মোবাইলের কল রিচিভ হবে তিনি সিরিয়াল পাবেন। অথবা অন লাইনে। অন্যথায় সিরিয়ালের গোপন ফিস না দিলে একমাসেও কাঙখিত ডাক্তারের নাগাল পাওয়া যাবে না। আর এমনও আছে যেখানে সরাসরি বা অগ্রীম সিরিয়াল নেয়া হয় না । ফলে দুরদুরান্তের রোগীরা পড়ে যায় চরম বিপদে।  আমার মেয়ের ব্যাপারে ঢাকার একজন স্বনাম ধন্য ডাক্তারের সিরিয়াল নেয়ার বেলায় উপরোক্ত সিরিয়াল সমস্যা পেইচ করতে হয় বারবার। ওনার সিরিয়াল দেওনেওয়ালার কাছে আমি তিন মাস আগে অগ্রীম সিরিয়াল দিতে চাইলে আমাকে সিরিয়াল দেন ৯৩নং।
       আর ক্লিনিক চিকিৎসায় রোগীকে ডাক্তারের ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেতে হলে ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে কল দিয়ে অপেক্ষার প্রহরের গুনতে হয় নয়তো আজরাইলের সাথে বোঝাপড়া করতে হয়।
সমাজে সবাই কিন্তু জটিল রোগী নন।  বিএমডিসি আইনের গ্যাঁড়াকলে প্যারামেডিকস সহ অন্যান্য ডাক্তারদের প্রাথমিক চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য সিজনাল সর্দিকাশির চিকিৎসা বা কৃমির ওষুধের জন্যও এমবিবিএস ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে বসে থাকতে হয় রোগীকে।
তাই জীবন ঘনিষ্ট ডাক্তারী পেশাকে প্রতিযোগিতাশীল আন্তরিকতামুলক করতে হলে দেশে ব্যাপকহারে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের মত প্যারামেডিকস ও এলএমএফ ডাক্তার তৈরীর শিক্ষাব্যবস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বিএমডিসি আইন সংশোধন করে মধ্যম মানের ডাক্তারদের পেশাগত স্বীকৃতি দিতে হবে বিশেষ ট্রেনিং এর মাধ্যমে। মেডিক্যাল কলেজের তুলনায় প্যারামেডিক্যাল ইনস্টিটিউটের সংখ্যা দ্বিগুন বা তিনগুণ করতে হবে। আর সবখানে মধ্যম মানের চিকিৎসকদের পদ রাখতে হবে।
তাতেই চিকিৎসা পেশাতে টিকে থাকার জন্য সকল শ্রেনীর ডাক্তারদের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতা চলতে থাকবে। তখন গ্রামে গ্রামে ডাক্তারের অভাব হবে না। চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেশের মানুষের হারানো সুদিন আবার ফিরে আসবে। এর অন্যথায় কি হচ্ছে তাতো এখন সবাই ভোগ করছি প্রতিনিয়ত।
          পরিশেষে ডাক্তার নেতা ফয়সাল ইকবালের ঘোষণা ( সাংবাদিকদের সন্তানদেরকে চিকিৎসা সেবা দেয়া বন্ধ করতে হবে) যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তা হলে ডাক্তারগণকে কী কী সমস্যায় পড়তে হবে তা একটু আলোচনা করা দরকার।
ডাক্তাররা যদি এভাবে সাংবাদিক, শিক্ষক, ড্রাইভার, ব্যবসায়ী, বাড়িওয়ালা,রেস্টুরেন্ট, আবাসিক ফ্লাট-হোটেল ও অন্যান্য পেশাজীবীদের চিকিৎসা ক্রমান্বয়ে বন্ধ করতে থাকেন তাহলে এমন একদিন আসবে যেদিন  সকল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক একযোগে ঘোষণা  দিবেন ডাক্তারদের সন্তানকে স্কুল-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাবেন না, বস্ত্র ব্যবসায়ীরা যদি বলেন ডাক্তারদের সন্তানদের কাপড় বিক্রি বন্ধ, সাংবাদিকেরা যদি বলে দেন ডাক্তারদের কোনো খবর বা বিজ্ঞাপন ছাপাবে না, বাড়িওয়ালারা যদি জানিয়ে দেন ডাক্তারদের পরিবারকে বাড়ি ভাড়া দেয়া নিষেধ, গাড়িওলারা যদি বলে দেন ডাক্তারদের সন্তানদের গাড়িতে তোলা হবে না,পানিওয়ালা যদি বলেন ডাক্তারদেরকে পানি দেয়া বন্ধ, ব্যবসায়ীরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ডাক্তারদের সন্তানদের মালামাল বিক্রয় নিষেধ করে দেন আর এভাবে প্রতিটি পেশাজীবী থেকে যদি ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ঘোষণা দেয়া হয় তাহলে ভাইজান ডাক্তারদের অবস্থা কেমন হবে একটু কল্পনা করে দেখলে সহজে বুঝা যাবে।
         ডাক্তারদের কাছে মানুষ সুখ বা শখ নিয়ে যায় না। ডাক্তারদের কাছে মানুষ যায় সমস্যা নিয়ে। এতে করে ডাক্তাররা ভাবেন অন্যপেশাজীবীরা মানুষ নন। অন্য পেশার মানুষ যতই শিক্ষিত হোক না কেন ডাক্তাররা তাদেরকে মানুষের মত ব্যবহার ও আচরন  করেন না। ফলে সবখানে ডাক্তারদের কাছে সাধারণ মানুষকে দুর্ব্যবহার ও হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে।  এই অবস্থার সুস্থ পরিবর্তন তখনই হবে যেদিন থেকে ডাক্তাররা রোগীদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে শিখবেন।
====================
ডাঃ সৈয়দ আবদুর রহমান
চিকিৎসক ও কলামিষ্ট