আদনান মেন্দেরেস ও শহীদ জিয়া : বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠবে কবে?

প্রকাশ: ১ জুন, ২০১৯ ৮:০৬ : অপরাহ্ন

সগির আহমদ চৌধুরী।। ৩০ তারিখটা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী ছিল। ঠিক তার তিনদিন আগে তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেসের ক্ষমতাচ্যুতি দিবস ছিল। বাংলাদেশের শহীদ জিয়া আর তুরস্কের শহীদ আদনানের মাঝে অনেক মিল।

১। তাঁরা দু’জনই তাঁদের দেশে বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তন করেছিলেন। ২। একনায়কতা ও একদলীয় শাসন-শোষণ থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে নাজাতের ব্যবস্থা করেছিলেন। ৩। উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতার নাগপাশ থেকে দেশকে উদ্ধারে প্রথম পদক্ষেপটা তাঁরাই গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৫০ সালে তুরস্কে আদনান মেন্দেরেসের ক্ষমতাগ্রহণের আগে এবং ১৯৭৫ সালের পরবর্তীকালে বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতাগ্রহণের আগে দু’দেশেরেই ধর্মীয় অবস্থা অনেকটাই একই ছিল। উভয় দেশে ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। তুরস্কে বতর্মান যে ইসলামের পুনর্জাগরণ এবং বাংলাদেশে যে ইসলামি দলের বহুল বিচরণ তার প্রারম্ভিক অবদানটা অবশ্যই মেন্দেরেস ও জিয়ার, এটি অস্বীকার করার কোনো জো নেই।

তুরস্কে কিন্তু আদনান মেন্দেরেসের অবদানকে অস্বীকার করা হয় না। ইসলামপন্থিরা তাঁকে বীরের মর্যাদা দেন, তাঁকে সশ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। ১৯৬০ সালের ২৭ মে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং ১৯৬১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শহীদ করে দেওয়া হয়। মারমারা সাগরের জনমানবহীন একটি ছোট্ট দ্বীপে এ ফাঁসি দেওয়া হয়। বর্তমান তুর্কি সরকার সেই দ্বীপকে ঘিরে গড়ে তুলেছেন মসজিদ, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টার, হোটেল ও আদনান স্মৃতি জাদুঘর। এসব করা হচ্ছে মহান আদনান মেন্দেরেসকে স্মরণী-বরণী করে রাখতে।

আদনান মেন্দেরেস ইসলামি নেতা ছিলেন না, বিশ্বাসে-দর্শনে তিনি সেক্যুলারই ছিলেন। হতে পারে, মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগকে রাজনীতিক স্বার্থে ব্যবহার করতেই তিনি তুরস্কে আরবি আযানের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাপার সেটা নয়, এমনকি তিনি কতোটা ইসলামি ছিলেন সেই বিষয়টাও এখানে বিবেচ্য নয় মোটেও, বরং তিনি যা করেছেন সেটি যে পরবর্তীকালে ইসলামি পুনর্জাগনের জন্য প্রারম্ভিকা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে সেটাই মূলত বিবেচ্য এখানে। আর তার জন্যই তাঁকে তুরস্কের ইসলামপন্থিরা স্মরণ করছে। তিনি সেক্যুলার ছিলেন, নামায-রোযা করেন না! ইত্যাদি ইত্যাদি আরও শত শত ভুল হয়তো তাঁর ছিল, কিন্তু সেই শত ভুলের মাঝে তাঁর একটা ভালোর জন্যই তুর্কি ইসলামপন্থিরা তাঁকে স্মরণ করেন, বীরের মর্যাদা দেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের। তাঁকে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা স্মরণ করেন না, বীরের মর্যাদা দেবেন দূরে থাক, বরং বহুবিদ সমালোচনায় নির্মমভাবে বিদ্ধ করা হয় তাঁকে। বাংলাদেশের শহীদ জিয়া যা করেছিলেন আদনান মেন্দেরেস তার সামান্যই করে যেতে পারেননি। বহুদলী রাজনীতি প্রবর্তন করেছিলেন, ধর্মীয় রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়েছিলেন, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করেছিলেন, সংবিধানের সূচনায় বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম সংযোজন করেছিলেন, কালিমার নির্জাস ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ সংযুক্ত করেছিলেন। তিনি যা করেছিলেন তাতে আখিরে ইসলামপন্থিরাই কি বেশি উপকৃত হয়নি? ইসলামপন্থিদের রাজনীতিক অধিকারে কি জিয়ার অবদান নেই? অস্বীকার করা যাবে?

বস্তুত বাংলাদেশের ইসলামপন্থি সীমাহীন সংকীর্ণ। নিজের দলের বাইরে কারো কোনো অবদানই তারা স্বীকার করতে চান না। আমি মনে করি, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব একক কারো দ্বারা সম্ভব নয়, কেউ সূচনা করবেন, কেউ সংগঠিত করবেন, কেউ একদিন তার পূর্ণতা দেবেন। তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ানের সমালোচনা হয়, তাঁকে কেউ কেউ ‍মুরতাদ-কাফির ঘোষণা করেও আত্মতৃপ্তি পেতে চান। আমি বিশ্বাস করি, এভাবে কারো ইসলামিত্ব এবং তার ইসলামের খাঁটিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা সমচীন নয়, ইসলামি আন্দোলন একটা চলমান প্রক্রিয়া। সূচনাটা একজন বেদীনের হাত ধরে হতে পারে, একজন ফাসিকের হাত ধরে সেটি বেগবান হতে পারে, একদিন একজন কামিল বুযুর্গ নেতৃত্বের দ্বারা সেটি পূর্ণাঙ্গ হতে পারে।

এখনই এরদোয়ানের কেন কামিল বুযুর্গের বেশ নেই, দাড়ি-টুপি নেই কেন? এখনই কেন ইসলামি হুকুমত কায়েম করছেন না তিনি এসব প্রশ্ন অবান্তর, অবাস্তব এসব প্রশ্ন। তিনিই সবকিছু করবেন বা করতে পারবেন না। তিনি কিছু করে গেলেন, পরবর্তীতে কালে অন্যরা এসে তাতে যোগ করবেন, আরও পরে কেউ পূর্ণাঙ্গতা দেবেন। আমাদের উচিত হবে, একজনের দশটা ভুল সত্ত্বেও একটা ভালো কাজের জন্য তাকে অভিনন্দিত করা। কিন্তু আমরা করি উল্টোটা: একশটি ভালো সত্ত্বেও একটা ভুলের জন্য তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেই! মুরতাদ-মুনাফিক ও কাফির আখ্যা দিয়ে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেই।