একজন প্রেমিক কবির প্রস্থান…

প্রকাশ: ১৪ জুলাই, ২০১৯ ৭:০৮ : অপরাহ্ন

ফারুক হোসেন শিহাব।।একাধারে তিনি ছিলেন কবি ও প্রেমিক পুরুষ। একবার তো বলেই ফেলেছিলেন, ‘আমাকে অনেকে কবি বলেন না। আমিও বলব না যে, আমি কবি। আমার লেখা পড়লে বুঝবেন আমার মনে কত ব্যথা, কত সুর, কত আনন্দ।’

তার ভাষায়, ‘আমার যৌবন আর বেশি দিন নেই। কয়েক বছর পর আমি মধ্যবয়স্ক হয়ে যাব। তাই যতোদিন পারি, এই ক্ষণস্থায়ী যৌবনকে উপভোগ করতে চাই।’ কথাগুলো যুক্তরাজ্যে গিয়ে বলেছিলেন ৮২ বছর বয়সের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তার এমন বক্তব্য থেকে বুঝা যায় কতটা ‘রোমান্টিক’ও ‘প্রেমিক পুরুষ’ ছিলেন তিনি। এমনি বহু রসালো বক্তব্য আর আলোচনা-সমালোচনায় আমাদের রাজনীতির মাঠ ছাড়িয়ে সাহিত্যাঙ্গনেও গুঞ্জন ছড়িয়েছেন এরশাদ।

কঠোর রাজনীতি জীবনের বাইরে তার ছিলো এক প্রেমিক মন। যে প্রেমিক মন রোমান্টিকতায় ভরপুর ছিলো। সেই রোমান্টিকতা থেকে তিনি কাব্য চর্চাও করেছেন অনেক। প্রেমিক মনে আঘাত পেয়েছেন, তবু বারবার ফিরে গেছেন ভালোবাসার কাছে।

তার কবিতা ভাবনা ও কাব্য জীবনের প্রতি তীব্র আগ্রহ ও ভালোবাসার বিষয়টি বিবেচনা করলে অনেকের মনে হতে পারে রাজনীতিবিদ কিংবা সেনাপ্রধান নয়, তার একান্ত তীব্র ইচ্ছে ছিলো কবি হওয়ার। মানব জীবনে এমনই লোভনীয় ‘কবি’ উপাধি। তাই তো জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি কবিতা ভালোবেসে এসেছেন। তার সেসব কাব্য সাধনার জন্যে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন।

কবি এরশাদের কবিতায় দেশের রূপ, সৌন্দর্য ও প্রকৃতির পাশাপাশি প্রেমের তীব্র আহ্বান লক্ষণীয়। তার একটি জনপ্রিয় কবিতা ‘প্রেমগীতি’। যেখানে কবি এরশাদ লিখেছেন- ‘ক্লান্ত বিকেলে অবশ পায়ে/ ঘুরেছি যখন এই পথে। শান্ত নদীর নীরব কিনারে/ দেখা হয়েছিলো তোমার সাথে।’

কবিতাটিতে তিনি প্রেমের তীব্র আহ্বানের কথা ব্যক্ত করেছেন এভাবে- ‘তোমার নয়নে নয়ন রাখিয়া/ বলেছিনু এসো প্রিয়া/ তাপিত হৃদয়ে ঝরনা ঝরাও/ প্রেমের অঞ্জলি দিয়া।’ এরকম বহু কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে কবি এরশাদের বাংলার রূপ, লাবণ্য, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেমের মতো বিষয়গুলো।

কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি প্রেমে পড়েছেন একাধিক নারীর। যা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে উঠে এসেছে নানাভাবে। একবার প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের সভাপতি নুরে-আলম সিদ্দিকী এরশাদ সম্পর্কে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রেমিকার সংখ্যা কত, তা হাতে গুনে শেষ করা অসম্ভব।’

তবে এর জন্য তিনি যেমন অনেক সমালোচিতও হয়েছেন। আবার এর কারণে অনেকের আগ্রহের জায়গাও তৈরি হয়েছে তার সম্পর্কে।

এরশাদের প্রেমিক হৃদয় বলে উঠেছিল, ‘এখন আর প্রেম-ভালোবাসা নেই। সমাজ থেকে প্রেম-ভালোবাসা উঠে গেছে’। তিনি যে একজন প্রেমিক, সেটি তার অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করবে না। আশির দশক এরশাদের প্রেমের দশক। আর সেই প্রেমের ইতিহাস প্রতারণারও বটে। এক প্রেমিকাকে তিনি দলের সংরক্ষিত কোটায় সাংসদ বানিয়েছিলেন, পরে ছুড়ে ফেলেছিলেন।

আরেক নারী যুক্তরাজ্যে গিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছিলেন। তার আরেক স্ত্রী বিদিশাকে তো একরকম নির্যাতিত ও অপমানিত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল। এরশাদের প্রেমঘটিত কাহিনিগুলো তার পতনের পরে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত হয়। অনেকের কাছে এসব এখনো মজাদার গল্প।

তার সাবেক স্ত্রী বিদিশা তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘এরশাদের প্রেমে পড়াটা ভুল ছিল এমনটা কখনো মনে হয়নি। এরশাদের মতো কেউ তো আমাকে ভেজা রুমালে শিউলি ফুল দিয়ে ঘুম ভাঙাবে না। এমন প্রেমিক পৃথিবীতে নেই। আমি তো মনে করি, এরশাদ এখনো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রেমিক। সেটা নাটক হয়ে থাকলে নাটক। কিন্তু আমি তো এনজয় করেছি।’

অন্যদিকে, ২৬ বছর বয়সী সেনা কর্মকর্তা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৫৬ সালে বিয়ে করেছিলেন কিশোরী রওশনকে। বিবাহ পরবর্তীকালে দূরে থাকা স্ত্রীকে প্রচুর চিঠি লেখার অভ্যাস ছিলো তার। সেসব চিঠি ছিলো প্রেমের রোমাঞ্চে ভরা।

এরশাদ চিঠি লেখেন স্ত্রীর কাছে। মধুর মধুর সব সম্বোধনে। চিঠির শেষে নিজের পরিচয়ে লেখেন- ‘পেয়ারা পাগল সাথী’, ‘বড্ড একাকী একজন’, ‘প্রেম-পূজারি’, আমি ‘বিরহী’! একবার একটি সভায় প্রস্থানরত স্ত্রী রওশনের হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘রওশন আমার আলোর মৌমাছি।’

তার বর্তমান স্ত্রী রওশন এরশাদকে নিয়ে তিনি একটা কবিতাও লিখেন। তা হলো-

‘নিঃসঙ্গ ধূসর বিশাল এক অন্ধকারে

আমি জেগে আছি

কোথায় ঊষার জ্যোতি

কতদূর আলোর মৌমাছি?

মেয়েদের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠ প্রেম নিয়ে এরশাদ নিজেই বলেছেন– ‘আমি কোন মেয়ের কাছে যাই না। মেয়েরাই আমার নিকট আসে। মূলত: আমার চেহারা আর অভিব্যক্তির মধ্যেই এক ধরনের প্রেমিক প্রেমিক ভাব আছে’।

এরশাদের প্রেমজীবন ছিলো ব্যাপক বিস্তৃত ও আলোচিত। জিনাত মোশাররফ, কণ্ঠশিল্পী শাকিলা জাফর, টিভি উপস্থাপিকা  নাশিদ কামাল এবং চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরীও এরশাদের প্রেমিকা কিংবা পরক্রিয়াসঙ্গী ছিলেন বলে জনশ্রুত রয়েছে। এমনকি লন্ডনের সুন্দরী মেরির সঙ্গেও তার প্রেম ছিল বলে খবর প্রকাশ পায়। এ ছাড়াও তৎকালীন সময়ে কয়েকজন চিত্রনায়িকার সঙ্গেও তার প্রেম ছিলো বলে অনেকেই ধারণা করেন।

হুসেইন মুহাম্মদ অসংখ্য কবিতা লিখেছেন, প্রচুর বইও প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার পাশাপাশি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সাহিত্যের অন্যান্য শাখা নিয়েও বই লিখেছেন। তবে কবিতার তার অপার প্রেম ছিলো। এখন অবধি তার লেখা ২৭টিরও বেশি বই বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে। অবশ্য, এরমধ্যে মাত্র ৪টি গদ্যগ্রন্থ বাকি সবই কবিতার বই।

এসব কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘হে আমার দেশ’, ‘ঈদের কবিতা’, ‘বৈশাখের কবিতা’, ‘প্রেমের কবিতা’, ‘একুশের কবিতা’, ‘যে কবিতা সুর পেল’, ‘জীবন যখন যেমন’ ও ‘এক আকাশে সাত তারা’ ইত্যাদি। এছাড়া এরশাদের সকল কবিতা এক মলাটে পাঠকের হাতে পৌঁছে দিতে আকাশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশ ‘এরশাদের কবিতাসমগ্র’ বইটি।