চোখে দেখা ইতিহাসের ভয়াবহতম সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিলের স্মৃতিগাঁথা

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল, ২০১৯ ৯:৫১ : পূর্বাহ্ন

আলহাজ কাউছার উদ্দিন কছির
তখন আমি ৫ম শ্রেণীর ছাত্র মনে হয় ১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিল এই দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ভয়াবহতম দিন। ঐ দিনে ‘ম্যারি এন’ নামক প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় লন্ডভন্ড করে দেয় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার পূরো উপকূল। লাশের পরে লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল চারদিকে।বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়েছিল। দেশের মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল প্রকৃতির করুণ এই আঘাত। স্বজন হারার আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে চারিদিকের পরিবেশ। প্রাকৃতিক দূর্যোগের এতবড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এদেশের মানুষ এর আগে আর কখনো হয়নি। পরদিন সারা বিশ্বের মানুষ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন ধ্বংসলীলা,আর্তনাদে কেঁপে উঠেছিল বিশ্ব বিবেক। বাংলাদেশে আঘাত হানা ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে নিহতের সংখ্যা বিচারে পৃথিবীর ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড় গুলোর মধ্যে অন্যতম। ২৯শে এপ্রিল রাতে বাংলাদেশে-র দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানা এ ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়টিতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘন্টায় প্রায় ২৫০ কিমি (১৫৫ মাইল/ঘন্টা)। ঘূর্ণিঝড় এবং তার প্রভাবে সৃষ্ট ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু, জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা আরো বেশি। মারা যায় ২০ লাখ গবাদিপশু। গৃহহারা হয় হাজার হাজার পরিবার। ক্ষতি হয়েছিল ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদ। এবং প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করে।
ঘূর্ণিঝড়ের সেই রাতে প্রথমে মনে করছিলাম বাতাস বইতেছে বাড়ির চারিপাশে অনেক আম আর নারিকেল গাছে,আমরা সবাই তখন আম আর নারিকেল কুড়াতে ব্যস্ত,বাড়ির ভিতরে অনেক আম আর নারিকেলের স্তুপ করে ফেললাম,হঠাৎ একটা টিন উড়ে এসে দরজার সমানে পড়ল তখন ভয়ে সবাই দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসে থাকলাম,আধ ঘন্টার মধ্যে বাড়ির বারান্ডায় এক হাটু পানি,সবাই চিন্তায় অস্তির হয়ে গেলাম,মা বাবা সবাই কান্নাকাটি করতেছে সেজ ভাইয়ের জন্য সে ছিল মাইল্ল্যা ঘোনা প্রজেক্টে,আল্লাহ্ আল্লাহ্ করতে করতে সকাল হল,ভাইকে খোঁজার জন্য বের হলাম আমি আর মেজ ভাই,রওনা হলাম মগখাল হয়ে সওদাগর ঘোনা হয়ে মাইল্ল্যা ঘোনা যাওয়ার জন্য,কিছু দুর গিয়ে আর পা সামনে যায়না,মগখাল আর খাল নাই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে মানুষ আর গরু-ছাগলের লাশে,আমি তা দেখে জোরে জোরে কান্না শুরু করে দিলাম,আরো পাঁচ ছয়জন মানুষ সেখানে জড়ো হল,কারো মুখে কোন ভাষা নাই,সবাই মিলে গাছ বাঁশ দিয়ে লাশের স্তুপ ফাঁকা করে নদী পার হলাম,কিছুদুর গিয়ে বাইশ্যা ঘোনা নামক জায়গায় একটা ছোট বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম ছোট বাচ্চাটির পাশে পড়ে আছে তার মায়ের লাশ,বাচ্চাটিকে মৃত অবস্থায় ও জড়িয়ে আছে মা,আবাক কান্ড মায়ের ভালোবাসা,আল্লাহ মাকে নিয়ে গেলেও বাচ্চাটিকে বাঁচিয়ে রাখছেন,সঙে যাওয়া লোকদের মধ্যে একজন বাচ্চাটাকে নিয়ে গেলেন,যা দেখে শিল্পী সিরাজ ভাই গান করেছিলেন( মারে বেইলত ভাতের অর্থ অইয়ে আরে দেনা ভাত—-) সামনে যতই যাই লাশ আর লাশ,শেষ পর্যন্ত আমাদের গন্তব্য স্থানে গিয়ে খবর ফেলাম সেজ ভাই একটা বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে,বেঁচে আছে শুনে আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করলাম,পরে তার মুখ থেকে শুনলাম রাতে ঝড় বাতাস শুরু হলে কোন প্রকারে একটা গাছে উঠে অনেক কষ্টে গাছ কে জড়িয়ে ধরে পানি থেকে বেঁচে গেছেন।সেদিনের নিজের চোখে দেখা স্মৃতি মনে পড়লে এখনও বুকের ভিতর ভূমিকম্প শুরু হয়,সবার সাথে ছোট ছেলে হিসেবে আমিও অনেক কে এক সাথে শত শত মানুষের জানাযা পড়ে কবর দিতে দেখলাম।
সেদিন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ত্রাণ তহবিল থেকে আশ্রয়হীন বেঁচে যাওয়া মানুষের মাঝে নৌকা বোট নিয়ে ত্রাণ বিতরণের সৌভাগ্য সিনিয়র নেতাদের সাথে আমারও হয়েছিল বড় ভাই যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্বাস উদ্দীনের জন্য। সিনিয়র নেতাদের মধ্যে আরো যাদের পেয়েছিলাম বর্তমান সাংসদ আলহাজ্ব জাফর আলম, তৎকালীন উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি শ্রদ্ধেয় নুরুল কাদের বি কম, সাধারণ সম্পাদক (বর্তমান কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি) এডভোকেট আমজাদ হোসেন, যুগ্ন সম্পাদক জিয়া উদ্দীন চৌঃ জিয়া, জামাল উদ্দীন জয়নাল, বর্তমান চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী ও জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য আমিনুর রশিদ দুলাল ভাই সহ অনেক কে,সেদিনের স্মৃতির কথা লিখতে গেলে শেষ করা যাবেনা। ভয়াবহ এই দিনে কক্সবাজার জেলা সহ সারাদেশের নিহত সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। স্মৃতিচারণে আলহাজ্ব কাউছার উদ্দীন কছির সাধারণ সম্পাদক, চকরিয়া উপজেলা যুবলীগ,সাবেক সাঃ সম্পাদক,চকরিয়া উপজেলা ছাত্রলীগ।##