ছোটবেলা থেকে বড়বেলা, আল মাহমুদ বিস্তৃত সবখানে

প্রকাশ: ১২ জুলাই, ২০১৯ ১:০৯ : পূর্বাহ্ন

সাহিত্য ডেস্ক।ছোটদের বই পড়াচ্ছেন? আল মাহমুদের ছড়া পড়তে দিন। সেরার সেরা। তারপর এসেছেন বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে তাজা তারুণ্যে, আল মাহমুদ আছেন সেখানেও। যৌবন ছাড়িয়ে মধ্য বয়সে দাঁড়িয়ে আছেন। পাঠ করুন আল মাহমুদ। জীবন ফিকে হচ্ছে, রঙ হারাচ্ছে বয়স। আল মাহমুদের পরিণত বাক্যের দিকে যান। নিঃসঙ্গতা কেটে যাবে।

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে কবি আল মাহমুদ জন্ম গ্রহণ করেন। গাঁয়ের গাছপালার মধ্যে একাকী ঘুরে বেড়ানো দুরন্ত কিশোর তিনি। শত বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে তিনি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন গ্রামের ছায়া ঢাকা পরিবেশে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে কবিতা লেখার অপরাধে তাঁকে ঘর ছাড়তে হয়। ভাষার সংগ্রামেমুখর সময়েও তিনি চুপ থাকতে পারেননি। সে থেকে আল মাহমুদ ভাষার জন্য ঘর ছাড়া কবি। ফলে কবি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশীদূর অগ্রসর হতে পারেননি। কিন্তু কবির অধ্যবসায় আর ঐকান্তিকতার বিনিময়ে তিনি আজ বাংলা ভাষার সুনিপুণ কারিগর।

‘আম্মু বলেন পড়রে সোনা

আববু বলেন মন দে

পাঠে আমার মন বসে না।

কাঁঠাল চাঁপার গন্ধে।

আমার কেবল ইচ্ছে করে

নদীর ধারে থাকতে

বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে

পাখির মত ডাকতে।

কবি আল মাহমুদ শুধু কাব্য, কবিতায় নয়, তিনি নির্ভিক, সৎ সাংবাদিক তাতেও আমাদের অনুস্মরণীয় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

তিনি লিখেছেন। [‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।’] এমন কবির পক্ষেই বলা সম্ভব, ‘ঢাকাই হবে বাংলা ভাষার রাজধানী’। আর ঢাকাকে বাংলা ভাষার রাজধানী করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান মোটেও কম নয়। এজন্য তাঁকে অনেক ত্যাগ শিকার করতে হয়। নানা প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়। কিন্তু তিনি কখনো নিরাশ হননি। এ বিশ্বাসী কবি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য পথে প্রান্তরে অনেক ঘুরেছেন। তিনি লিখেন- কেউ হতে চায় সন্ধ্যা তারা কেউ বা নদীর ঢেউ/আমায় যদি মন্ত্রবলে বদলে দিত কেউ/আদম হাওয়ার কষ্ট বড় হতাম যদি জিন/জিনের দেহে দেখবে না কেউ কায়ার কোনচিন।

কবি বড়দের জন্য যেমন মজার মজার লেখা উপহার দিয়েছেন তেমনি ছোটদের জন্যও তার অবদান কম নয়। তার কবিতায় তিনি ছোটবেলার স্মৃতিময় দিনগুলোকে ছড়ার মাধ্যমে এভাবে তুলে ধরেন,

সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে

কর্ণফুলীর পুলটায়

দুধ ভরা ঐ চাঁদের বাটি

ফেরেশতারা উল্টায়।

সবাই যখন পড়ছে পড়া

মানুষ হবার জন্য

আমি না হয় পাখি হবো

পাখির মত বন্য।’

কবি আল মাহমুদ একজন সার্থক আধুনিক কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কিশোর কবিতার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। আধুনিক বাংলা কিশোর কাব্যে আল মাহমুদ অপ্রতিদ্বনদ্বী। তাঁর কিশোর কবিতার তুলনা হয় না। প্রতিটি কবিতা মন ছুয়ে যায়। হৃদয় আনন্দে দুলে উঠে। কবি তাঁর কবিতার মাধ্যমে দেশের প্রকৃতি, ফুল, ফল, আচার অনুষ্ঠানকে এমন সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যার তুলনা কবি নিজেই। তাঁর কবিতায় তিনি প্রকৃতির সাথে একান্তভাবে মিশে যান। যেন প্রকৃতি তার সাথে আলাপে মত্ত্ব। সবাই তাঁকে পেয়ে যেন আনন্দে লাফিয়ে উঠে। তাদের সাথে গল্পে গল্পে কেটে যায় তাঁর দিন। তিনি তাঁর একটি কবিতায় ‘নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল। ছিটকিনিটা আস্তে খুলে বেরিয়ে গেলাম ঘর ঝিম ধরা ঐ মস্ত শহর কাঁপছিল থরথর। দরগাতালা পার হয়ে যেই মোড় ফিরেছি বাঁয় কোত্থেকে এক উঠকো পাহাড় ডাক দিলো আয় আয়। পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লাল দীঘিটার পাড় এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দারবার। আমায় দেখে কলকলিয়ে দীঘির কালো জল বললো এসে আমরা সবাই না ঘুমানোর দল। [পকেট থেকে খোলো তোমার পদ্য লেখার ভাঁজ। রক্ত জবার ঝোঁপের মাঝে কাব্য হবে আজ। দীঘির কথায় উঠলো হেসে ফুলপাখীরা সব। কাব্য হবে কাব্য হবে পড়লো কলরব। কি আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই পাখির কাছে ফুলের কাছে মনের কথা কই।

তিনি ফুল পাখীদের সাথে কথা বলেন, কথা বলেছেন গাছ-গাছালীর সাথে। তার প্রতিটি কবিতা নিয়ে আসে ভিন্ন স্বাদ, চমৎকার বিষয় বৈচিত্র। সে কারণেই কবি আল মাহমুদ ছোট-বড় সবার প্রিয় কবি। আল মাহমুদের ভাষা, নির্মাণ শৈলী, বিষয়-বৈচিত্র্য এত চমৎকার, এত উচ্চমানের যে তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো শক্তিশালী কবি আর কেউ নেই।