বিপন্ন জলজ প্রকৃতি, বিলুপ্ত জীবন ও সংস্কৃতি

প্রকাশ: ৫ জুন, ২০১৯ ৮:০৭ : অপরাহ্ন

সবুজ শ্যামল, সজল প্রকৃতি প্রাণের বৈচিত্র্য মানেই বাংলাদেশ। গ্রামবাংলার প্রাণ-প্রকৃতিতে প্রভাবিত কবি-সাহিত্যিক। সেই চিরচেনা প্রকৃতি আজ প্রাণহীন এক মরুময় ধূসর রাজ্য। যে নদী সারা বছরই কুল কুল ধ্বনি করে বয়ে চলত, সেই নদী দখল, দূষণ, ভরাটে আজ রুক্ষ বালিকার এক ধূসর প্রান্তর। নদী-নালায় সারা বছরই পাওয়া যেত হরেক প্রকার মাছ। জেলে সম্প্রদায়ের পেশা এসব নদীকে কেন্দ্র করে। গ্রামঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট ছোট নদী-নালায় চৈত্র-বৈশাখ মাসে হাঁটুজলে গ্রামের বাসিন্দারা মাছ ধরার উৎসব ঘোষণা করত বিশেষ দিনে। সারিবদ্ধভাবে চাবিজাল, ঠেলাজাল, খেওয়াজাল, পলো ইত্যাদি দিয়ে চলত মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। সেই সমতল ভূমির ছোট-বড় জলাশয়ে একসময় বহুল প্রচলিত সেই মাছ ধরার উৎসব আজ আর নেই। নদীতে নেই পানি। মৃতপ্রায় নদীতে স্বল্প পরিমাণে পানি থাকলেও তাতে নেই মাছ, নেই মাঝিমাল্লা-জেলে সম্প্রদায়ের পেশার বর্ণিল বৈচিত্র্য। আর প্রতিবেশে নেই প্রাণবৈচিত্র্যের বিন্যাস। বর্ষার প্রথম বৃষ্টির পানিতে প্রাণের পুনর্জন্মস্থল হতো এসব জলাভূমি। অঝোর ধারায় বর্ষা-বাদলে নদী-নালা থেকে মাছ ছড়িয়ে পড়ত বিল-ঝিল, মাঠ-ঘাটে। বর্ষা-বাদল দিনে আবার মাছ ধরার উৎসবে মুখরিত হতো সারা গ্রামবাংলা। আবার মাঝিমাল্লা-জেলেদের নদীকে কেন্দ্র করে জারি-সারি গানে মুখরিত হতো। বর্ষায় বড় বড় নদীর মাছ চলে আসত ছোট ছোট নদীতে। আর নদী-নালা থেকে বিল-ঝিলে, সেখান থেকে মাছ ছড়িয়ে পড়ত মাঠ-ঘাট সর্বত্র। তাই তো প্রবাদ আছে, ‘বানের আগে ডারকিনা দৌড়ায়’, ‘তিন পুঁটিতে বিল গাবায়’। চাষীরা বর্ষা নামার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়তেন মাঠে হালের বলদ আর লাঙল নিয়ে। হালের পেছন পেছন গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা ঘোলা নরম জল-কাদায় কৈ, পুঁটি, টাকি, শিং-মাগুরসহ হরেক মাছ ধরত সহজেই। শুধু কি তা-ই; ছোট মাছ, কেঁচো, কাঁকড়া সহজ শিকারের সুযোগ নিত গোবরে শালিক, ভাত শালিক, বকসহ অনেক প্রজাতির পাখি। প্রাকৃতিক লাঙল কেঁচোকেও পেত সহজেই। এদিকে আষাঢ়ের দীর্ঘ দুপুরে বিলের হাঁটুজলে যেন সাদা তাঁবু টাঙিয়ে বসত বকের হাট।

বাংলার বর্ষা মানেই যেন প্রাণ-প্রকৃতির বিশুদ্ধ বিনোদন। বাড়ির আশপাশে মাটি কেটে মাটির দেয়ালের ঘর তৈরি করা হয়। সেই খাল-খন্দে বসন্ত বর্ষার ছিপছিপে জলে শীতনিদ্রা ঝেড়ে বড় বড় সোনা ব্যাঙ, কোলা ব্যাঙ, সবুজ ব্যাঙের বসত বসন্তের মিলন মেলা। ঘ্যানর ঘ্যান কোলাহলে যেন পালাগানের আসর চলত পাড়ায় পাড়ায়। গ্রামের দুষ্টু দামাল ছেলেরা মজা লুটত তাদের দাবড়িয়ে ধরে। এদিকে চাষীরা আবহাওয়া বোঝাপড়ায় বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা গণনা করতেন ব্যাঙের ঘ্যা-ঘ্যো ডাক বিশ্লেষণ করে। এ নিয়ে প্রচলিত খনার বচন ‘ব্যাঙ ডাকে ঘন ঘন, শীঘ্র বর্ষা হবে যেন’—কোনো চাষীরই অজানা নয়। এ ব্যাঙ কীটপতঙ্গ খেয়ে চাষীদের সহায়তা করত। তাই ব্যাঙকে ‘পোকা মারার প্রাকৃতিক যন্ত্র’ বলা হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই ছোট-বড় জলাশয়ে লাখো কোটি কচিকাঁচা ব্যাঙাচির টলটল জলে কিলবিলিয়ে চলা নজর কাড়ত। একটি এলাকার পরিবেশ কেমন, তা পরিমাপে এসব ব্যাঙই সূচক হিসেবে কাজ করে। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) ২০১৫ সালের রেড লিস্ট বা লাল তালিকা অনুসারে বাংলাদেশে ৪৯ প্রজাতির ব্যাঙ রয়েছে। এর মধ্যে ১০ প্রজাতির ব্যাঙ বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। তবে আমার মনে হয় সমীক্ষাসংক্রান্ত তথ্যের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে গ্রামবাংলার জলাশয়ে ব্যাঙের বিচরণ একেবারেই চোখে পড়ে না।

বর্ষায় মৃদু স্রোতের মাঝে আড়ালে শামুক-ঝিনুকের শান্তশিষ্ট চলার মনোরম দৃশ্য কখনই ভোলার নয়। শামুক-ঝিনুক বর্ষা-বাদলে ছড়িয়ে পড়ত মাঠ-ঘাটে। জমির আইলে কাঁকড়ার করা গর্ত দিয়ে বা কাটা আইলের ঢালুতে নামা জলের মৃদু স্রোতে ভিড় জমাত ছোট বড় নানা প্রজাতির শামুক-ঝিনুক। ধানের জমির আইলের ধারে মুক্তার দানার মতো শোভা পেত শামুকের থোকা থোকা জমাট বাঁধা ডিম। হাতের তালুতে নিতেই শীতল পরশে স্বর্গীয় অনুভূতি। বর্ষায় অনেকের পায়ে চালুনির ন্যায় ফুটি ফুটি ক্ষত দাগ (স্থানীয় নাম চ্যানলা) হলে গ্রামের কেউ কেউ আবার পা দিয়ে এসব ডিম ভাঙত সেরে যাবে এ ধারণা থেকে। অনেকে চোখের অসুখ সারাতে শামুকের জল দিত চোখে। শুধু কি তা-ই, ছাগলের অসুখ হলেও মৃত শামুকের খোলসের মালা গলায় পরিয়ে দিত অসুখ সেরে যাবে বলে। এ থেকে বোঝা যায়, গ্রামের লোকজন প্রকৃতির প্রতিটি জীব-উপাদানের ওপর কতটা ভরসা ও বিশ্বাস করত। শুধু মানুষ কেন, প্রতিটি প্রাণিকুল পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। বাড়ির আশপাশের পুকুরগুলোয় হাঁস ডুব দিয়ে ছোট ছোট প্রজাতির শামুক (যাকে স্থানীয়ভাবে টাটা বলে) খেত পেট ভরে। আবার আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সংকেতে শামুকের আচরণ সম্পর্কে বিজ্ঞ চাষীদের ভালোই জানা আছে। খনার বচন ‘ধান গাছে শামুক পা, বনবিড়াল করে রা; গাছে গাছে আগুন জলে, বৃষ্টি হবে খনা বলে।’ এর অর্থ শামুক ধান গাছ বেয়ে উপরে উঠলে, বনবিড়াল উচ্চৈঃস্বরে ডাকলে শিগগির বৃষ্টি হয়। প্রকৃতির কোনো কিছুই অবহেলা করতেন না গ্রামের চাষী-জেলেরা। ছোটখাটো বিষয়বস্তুকে অবহেলা করলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এ নিয়েও একটি প্রবাদ আছে—‘পচা শামুকেও পা কাটে’। খাল-বিল, নদী থেকে ঝিনুক কুড়িয়ে নানা পদ্ধতিতে চুন তৈরি করা চুনারু বা চুনতা বা যুগী সম্প্রদায়ের ছিল বৈচিত্র্যময় এক পেশা। আজ ঝিনুকের বিলুপ্তিতে পৈত্রিক পেশা হারিয়েছে চুনারু বা চুনতা সম্প্রদায়।

অফুরন্ত প্রাণশক্তির আধার বাংলার সজল প্রকৃতির জলাভূমি আজ আমরা মানুষ প্রজাতি দ্বারা শোষণ, শাসন, আহরণে রুক্ষ করছি প্রতিনিয়ত। জলাভূমি দখল, দূষণ আর বর্জ্য বিষে ভরাটের মাধ্যমে বিনাশ করছি গোচরে অগোচরে। একসময় পুকুর খনন করা ছিল সম্ভ্রান্ত সংস্কৃতি। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির গর্ব ছিল শানের ঘাট বাঁধা পুকুর। আজ নতুন পুকুর খনন করা হয় না। করা হয় না সংস্কার। উল্টো সেসব পুকুর ভরাট করে উঁচু দালান তৈরি হচ্ছে পল্লী গ্রামেও। আগের দিনে মাটির বাড়ি তৈরিতে পাড়ার আশপাশে মাটি খনন করে ছোট ছোট জলাশয় তৈরি হতো, আজ উন্নয়নের ছোঁয়ায় মাটির বাড়ি ভেঙে সেসব গর্ত ভরাট করে কঠিন কংক্রিট বাড়ি তৈরি হচ্ছে যত্রতত্র। আজ নেই পুকুর, হাতেগোনা দু-একটা থাকলেও সংস্কারের অভাবে নেই গভীরতা; নদী-নালা, বিল-ঝিল দূষণে মৃত। বড় যে দু-চারটা আছে, সেগুলোয় নেই নাব্যতা, নেই পানির পর্যাপ্ততা, নেই প্রাণের বৈচিত্র্য। মাছ আহরণে বছরে একাধিকবার বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হচ্ছে জলাশয়ের প্রাণিকুলকে। কোনো কোনো মাছ চাষের পুকুর জাল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় মাছরাঙা, পানকৌড়ি, বক, শালিকসহ অসংখ্য পাখিকে বঞ্চিত করে। মত্স্য উৎপাদনের নামে রাজনৈতিক দলের লোকজনদের ইজারা দিয়ে এবং কোনো কোনো নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর চলাকে রোধ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। জেলে সম্প্রদায়কে পেশা থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে নদীর প্রাণপ্রবাহকে হত্যা করে। আবার বন্যা রোধের নামে প্রাণবৈচিত্র্যের বিষয় বিবেচনা না করে অপরিকল্পিতভাবে বেড়িবাঁধ দিয়ে নদী সংযুক্ত খাল-বিল, মাঠ-ঘাটে পানি প্রবেশের পথ বন্ধ করা হচ্ছে। ফলে স্থবির হচ্ছে প্রাকৃতিক প্রাণের প্রকাশ ও বিকাশ। জলাশয়ে আজ মাছ নেই, শামুক-ঝিনুক নেই, নেই ব্যাঙের ঘ্যা-ঘ্যো পালা করে ডাকা। নেই কেঁচোর মাটি ছিদ্র করে উপরে ঠেলে উঠিয়ে স্তূপ করা, নেই বিল সাদা করে বর্ষার দুপুরে হাট বসা, নেই পুকুরের ওপর নুয়ে পড়া বটের ডালে দুটি মাছের আশায় চুপটি মেরে মাছরাঙার বসে থাকা। নেই গ্রামের বাঁশঝাড়ে তেঁতুল গাছে রাতচোরা পাখির সারা রাত গান গাওয়া। এর সঙ্গে হারিয়ে গেছে গরুর লাঙল ধরে চাষীর মন মাতানো গান, জেলে বা মাঝির মাঝনদীতে গলা ছেড়ে গাওয়া জারি-সারি গান। আছে সর্বত্র শুধু পুঁজিবাদের ধারায়, ভোগবাদের তাড়নায়, উদরপূর্তির আত্মকেন্দ্রিকতায় অন্ধ আয়োজন। কৃষ্টি-কৃষিতে বর্জ্য বিষ প্রয়োগে, রাসায়নিক সার ব্যবহারে, কলের লাঙলের কর্ষণে প্রাণহীন আজ জলজ প্রকৃতি। ফলে জলজ প্রকৃতি থেকে আজ ব্যাঙ-শামুক, ঝিনুক, কেঁচো, সাপ বিপন্ন-বিতাড়িত-বিলুপ্ত। কৃষিতে বিষের ব্যবহার শুরু হয় পঞ্চাশের দশক থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে বিনা মূল্যে বিতরণের মাধ্যমে। তখন থেকে সূত্রপাত হয় প্রকৃতির বিপন্ন বিনাশের যজ্ঞ। এদিকে প্রযুক্তির প্রসারে গরু-মহিষের লাঙলকে বিদায় জানিয়ে কলের লাঙল পা-টিলারের ঘূর্ণায়মান লোহার ফালে কেটে-কুটে ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক এমনকি কেঁচোসহ সব প্রাণীকে হত্যা করা হচ্ছে বেখেয়ালির মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের র্যাচেল কারসন নামের লেখিকা ১৯৬২ সালে ‘দ্য সাইলেন্ট স্প্রিং (মৌন বসন্ত)’ বইতে বলেছেন, শিল্পায়নের ফলে ডিডিটি জাতের বিষের ব্যবহারের ফলে বসন্তে পাখিরা আর ডাকবে না! তার ডিডিটি বিষের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার ও আন্দোলনের ফলে পরবর্তী সময়ে এ প্রাণঘাতী বিষের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে সেসব নিষিদ্ধ বিষ বিশেষ চক্রের দ্বারা আমদানি হয়ে অনেকদিন পর্যন্ত ব্যবহার চলতে থাকে চাষাবাদে। আবার অন্যান্য বিষ বস্তুকে বরণীয় করতে কীটনাশক নাম দেয়া হলো করপোরেটের বহুমাত্রিক কৌশল। আজ কৃষিতে সব ফসলে এত পরিমাণ বিষ ব্যবহার করা হচ্ছে যে, তাতে প্রাকৃতিক লাঙল কেঁচোকে সমূলে হত্যা করে বিলুপ্ত করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ‘পোকা মারার প্রাকৃতিক যন্ত্র’ ব্যাঙকে। মৌমাছি, ফড়িং, প্রজাপতিসহ অসংখ্য উপকারী পতঙ্গ বিষের ব্যবহারে বিলুপ্ত প্রকৃতি থেকে। অথচ যে কেঁচো বিনা শ্রমমূল্যে দিবারাত্রি মাটি খনন করে নরম করে ফসলের শিকড় প্রসারে সহায়তা করত, যে কেঁচোর পরিত্যক্ত মাটিতে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় হরমোন উপাদানসহ অনেক আবশ্যিক মৌল পুষ্টি উপাদান যোগ করত, আজ সেই মাটির ঘাটতি মেটাতে বহুজাতিক কোম্পানির বহুমাত্রিক কৌশলে হরমোনসহ অন্যান্য রাসায়নিক সার কৃষক ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। মৌমাছি, বোলতা, ফড়িং, প্রজাপতি, মাকড়সা, পাখি, ব্যাঙসহ অনেক প্রাণী, যারা অনিষ্টকারী কীটপতঙ্গ দমন করত, আজ বিষ প্রয়োগে সেসব উপকারী প্রাণী বিপন্ন, বিতাড়িত, বিলুপ্ত হলেও অনিষ্টকারী কীটপতঙ্গ রয়ে গেছে আরো অদমনীয় হয়ে। বিষে শুধু যে কীটপতঙ্গ ধ্বংস হয় তা নয়, কীটপতঙ্গভুক পাখিরও মৃত্যু ঘটে। ব্যবহূত বিষ যোগ হচ্ছে জলাশয়ে। পানিতে বিষের পরিমাণ প্রথম অবস্থায় কম হলেও খাদ্যচক্রের মাধ্যমে ভারী ধাতুর যৌগ উপাদান বাড়তে থাকে এবং জলের প্রাণীর প্রজাতিকে ধ্বংস করে সমূলে। আবার যত্রতত্র স্থাপিত শিল্পের বর্জ্য বিষ পরিশোধন না করে সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদীনালায়।

বর্তমানে আবার এ কীটনাশক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর—এ বার্তা করপোরেট কোম্পানি প্রচার করে পোকা দমনে বা প্রতিরোধে আরেক মরণঘাতী জিএমও (জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম) শস্য বিটি বেগুন, গোল্ডেন রাইস ইত্যাদি চাষাবাদে পুঁজিবাদের নতুন ফাঁদ পেতেছে এবং সরকারি উদ্যোগে তা চাষাবাদও হচ্ছে। এটা কৌলিকতান্ত্রিকভাবে ইকো সিস্টেমকে ধ্বংস করবে। যে বিটি বেগুন ভারত ও আমেরিকার করপোরেট কোম্পানি উদ্ভাবন করলেও তাদের দেশে আজও চাষের অনুমোদন দেয়া হয়নি; রাশিয়া, ইউরোপসহ উন্নত দেশে জিএমও শস্য চাষাবাদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অথচ আমাদের দেশে বিশেষ মহলের অসৎ মতলবে সরকারি উদ্যোগে কৃষি অধিদপ্তরের মাধ্যমে আজ সারা দেশে তা চাষাবাদ হচ্ছে। প্রাণিকুলকে রক্ষা করতে এখনই জিএমও শস্য চাষাবাদ নিষিদ্ধ করা উচিত।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে পুঁজিবাদের ধারায় প্রকৃতিকে লুণ্ঠন করে প্রাণবৈচিত্র্যের বিনাশে নিজেদেরই আজ বিপর্যস্ত করে ফেলেছি। এর পরিবর্তে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটিয়ে সব প্রাণী প্রজাতি তথা জলজ প্রকৃতির সুখ ও সমৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ভুটান ২০০৮ সাল থেকে জিএনএইচ অনুসরণ করছে। জিএনএইচের অর্থ গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস। এ সূচক উন্নয়ন বা বিকাশের একটি সামগ্রিক পদ্ধতি, যেখানে মানুষই নয়, প্রকৃতির সব উপাদানকে বিবেচনায় নেয়া হয়। পৃথিবীতে প্রকৃতির কোনো কিছু মানুষের শোষণ ও লুণ্ঠনের জন্য নয়। অন্যান্য প্রাণীরও রয়েছে বেঁচে থাকার অধিকার। প্রতিটি প্রজাতির পরস্পরের সঙ্গে আত্মসম্পর্কের মাধ্যমে আদান-প্রদানে হবে বিকাশ ও বৃদ্ধি। প্রকৃতি হলো আমাদের প্রকৃত আমানত। প্রকৃতিকে পরিচর্যার মাধ্যমে মুনাফা অর্জন অর্থাৎ প্রকৃতির দানে মানব প্রজাতির বিকাশ, বৃদ্ধি, উন্নয়ন যৌক্তিক। যেমন একটি ফলদ বৃক্ষের পরিচর্যায় প্রচুর ফল পেয়ে থাকি। গাভীর কাছ থেকে পাই দুগ্ধ। পৃথিবীতে কোনো একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে মানবকুলকে চরম সংকটের মধ্যে পড়তে হয়। যদি মৌমাছি না থাকে, ফুলের পরাগায়ণ হবে না, পরাগায়ণ না হলে ফল ধরবে না, ফল না হলে আর বৃক্ষ জন্মাবে না, আর বৃক্ষ না জন্মালে পশু-পাখিসহ মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তেমনি শামুক-ঝিনুক, ব্যাঙসহ অসংখ্য প্রাণী প্রজাতিকে যে জলজ প্রকৃতিতে বর্জ্য বিষ প্রয়োগে হত্যা করছি, এর সংকট হিসাব করা আমাদের ক্ষমতার বাইরে। প্রকৃতিকে প্রকৃতি দ্বারাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উন্নয়ন করতে হবে।

প্রকৃতির ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং নির্বিচারে নগরায়ণ এবং সর্বত্র শিল্পায়নে জীববৈচিত্র্যের ওপর মহাবির্পযয় নেমে এসেছে। সময় এসেছে প্রকৃতিকে জীবন্ত মানবসত্তা বিবেচনায় তার অধিকার প্রতিষ্ঠার। মানবজাতি শ্রেষ্ঠত্বের ভ্রান্ত ধারণা পরিবর্তন করে প্রকৃতিতে সব জীবের সমান অধিকার রয়েছে মর্মে আমাদের প্রথমে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। নদীর অধিকার আছে প্রাকৃতিক নিয়মে প্রবাহের। জলাশয়ের অধিকার রয়েছে তাকে দূষিত না করার। আজ সচেতন বিশ্বে ল্যান্ড ইথিকস, ডিপ ইকোলজির মতো বিজ্ঞানভিত্তিক দর্শন নিয়ে আলোড়ন ও আন্দোলন চলছে। ১৪০ বছর ধরে নিউজিল্যান্ডের মাওরি উপজাতিরা (এ জনগোষ্ঠী নিজেদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি অংশ মনে করে) হোয়াংগানুই নদীকে জীবন্ত সত্তার মর্যাদা দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের  সংসদ দেশটির ওই নদীকে মানুষের মর্যাদা দিয়ে আইন পাস করে। ভারতের উত্তরাখণ্ড প্রদেশের একটি আদালত গঙ্গা ও যমুনা নদীকে জীবন্ত মানবীয় সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২০১৭ সালের ২০ মার্চ রায় প্রদান করেন। ওই বছর জুলাইয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আইনি জটিলতার কারণে নদীকে জীবন্ত মানবসত্তা বলা যাবে না মর্মে ওই রায়কে নাকচ করে দিলে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। আমাদের দেশে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামের মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন তুরাগ নদের সব ধরনের মাটি ভরাট, দখল ও নির্মাণকাজ বন্ধের ব্যাপারে নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করে। নিউজিল্যান্ড ও ভারতের উত্তরাখণ্ড আদালতের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এ বছর ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এ মামলার রায় প্রদান করেন। সজল প্রকৃতির সমগ্র বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি নদী-নালা, খাল-বিল-ঝিলের ওপর প্রকটভাবে নির্ভরশীল। তাই শুধু নদী নয়, সব জলাশয় ও জীববৈচিত্র্যকেও জীবন্ত মানবসত্তা বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। তবে এখানে বলা প্রয়োজন, জলজ প্রকৃতি শুধু জীবন্ত মানবসত্তাই নয়; তার অবদান, ভূমিকা এর চেয়েও বেশি কিছু। সজল প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন হলে রুক্ষ, নিষ্ঠুর ও  রুধিরাক্ত ঘাতক মরু সংস্কৃতি গ্রাস করবে সারা বাংলাকে। এ প্রকৃতি বিপন্ন হলে শুধু মানুষ নয়, সারা পৃথিবীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।

 

লেখক: সাংস্কৃতিক কর্মী