ব্যাংক থেকে ২২,৫০২ কোটি টাকা লোপাট

প্রকাশ: ৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১২:৩৬ : অপরাহ্ন

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক।। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুই মেয়াদে ব্যাংক থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংকের টাকায় অনিয়ম-দুর্নীতি হলেও সরকারের তরফ থেকে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

যাচাই-বাছাই ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ দেওয়া হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন অনেকে। সার্বিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।

রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের এমন ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ে কী করিব?’ শীর্ষক সংলাপে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে এমন মন্তব্য করা হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) পরিচালক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। এর বাইরে ব্যক্তি উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন ব্যাংকের প্রতিনিধিরা উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন।

মূল প্রবন্ধে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

সরকারি ব্যাংকগুলোতে এখন ২৮ শতাংশের বেশি ঋণখেলাপি। ব্যাংকের মালিক, পরিচালক ও এক শ্রেণির অসত্ ব্যাংকারের যোগসাজশে জনগণের আমানত দুর্নীতিবাজদের হাতে চলে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের কারণে মূলধন সংকটে পড়া এসব ব্যাংককে বছরের পর বছর ধরে অর্থ দিয়ে যাচ্ছে সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, ব্যাংকের পরিচালক থাকার শর্তে শিথিলতা, সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ব্যাংকিং খাতে দুরবস্থা বেড়েই চলেছে।

ব্যাংক খাতের সুরক্ষায় নির্বাচনের পর সিপিডি নাগরিক কমিশন গঠন করবে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই কমিশন ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরবে। ব্যাংক খাত নিয়ে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা হবে। সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনসহ বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হবে। তিনি আরো বলেন, ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছে। এ খাত রক্ষায় নাগরিকদের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। নির্বাচনের আগে সোচ্চার হওয়ার প্রধান সময়। নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক রক্ষার ঘোষণা থাকতে হবে। রাজনৈতিক নেতারা ব্যাংক খাতকে নিষ্কৃতি দেবেন—এমন ঘোষণা দিতে হবে।

ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, গ্রাহকের আস্থা উঠে যাওয়ায় এখন অনেকেই নিরাপদ ব্যাংকের খোঁজ করেন।

আগে এমন সংশয় ছিল না। ব্যাংকিং খাতকে রক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ বন্ধ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো উন্নতি হলেও তা টেকসই হবে না। তিনি বলেন, ‘একসময় আইন করে ঋণখেলাপি, অনিয়মকারী ব্যাংক মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আবার আমরা পেছনের দিকে যাচ্ছি। নিয়ম-কানুন শিথিল করা হচ্ছে। ভোটের আগে হাস্যকরভাবে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা সুবিধা নিয়েছেন। তাঁরা নতুন করে ঋণ নিয়ে পুরনো খেলাপি ঋণের কিছু অংশ পরিশোধ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হয়েছেন। ’

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকের পর্ষদে রাজনীতি ঢুকেছে। ব্যাংকিং খাত রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। রাজনৈতিকভাবে বিকৃত প্রণোদনা বাতিল করতে হবে। ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের পেছনে ছুটছে আর ছোটরা ঋণের জন্য ব্যাংকে ব্যাংকে দৌড়াচ্ছে।

খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ব্যাংকের মূলধনে পরিচালকদের মালিকানা ৯ শতাংশের মতো। আর ৯০ শতাংশের বেশি অর্থের মালিক আমানতকারীরা। পরিচালকদের পক্ষে পর্ষদে কথা বলার লোক থাকলেও মূল মালিকদের প্রতিনিধি নেই। ফলে পরিচালকরা লুটপাটের সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিকভাবে ব্যাংকের মালিকরা অনেক প্রভাবশালী। তাঁরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর খবরদারি করছেন। নিজেদের স্বার্থে আইন পাল্টে ফেলেছেন। আইনে আছে পরিচালক হতে হলে ২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে হবে। কিন্তু লুটপাট ছাড়া এত টাকার মালিক হওয়ার কথা নয়।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বড় গ্রাহকদের হাতে ব্যাংকের ঋণ ও মালিকানা কেন্দ্রীভূত। সুশাসনের অভাবে আমানতকারীদের স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়ছে। ব্যাংক খাত রক্ষায় অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ বাতিল করতে হবে। খেলাপি গ্রাহকদের অসীম সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান বলেন, খেলাপি অর্থ আদায় করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। এ জন্য সরকারপ্রধানকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল বলেন, ঋণখেলাপি ও ব্যাংক লুটেরাদের নির্বাচনে মনোনয়ন না দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফারমার্স ব্যাংকের এমডি এহসান খসরু বলেন, রাজনৈতিকভাবে একজন চরম প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাঁর আশপাশের মানুষ ফারমার্স ব্যাংককে শেষ করেছে। চাকরি যাওয়ার ভয় এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় অসত্ পরিচালকদের সঙ্গে ব্যাংকাররা হাত মেলাতে বাধ্য হচ্ছেন।

মূল প্রবন্ধে ফাহমিদা খাতুন আরো বলেন, গত ১০ বছরে ১৪টি ব্যাংক থেকে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনিয়মের ফলে মূলধন হারানো সরকারি ব্যাংকগুলোকে ১৫ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। প্রয়োজন না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং খাত পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করছে না।

পরিচালকদের অতিমাত্রায় প্রভাব বিস্তার আর হস্তক্ষেপের কারণে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে দাবি করেন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা।