ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ, সিকিম দখল ও মীরজাফর লেন্দুপ দোর্জি

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট, ২০১৮ ১০:৪৭ : পূর্বাহ্ন

আতিকুর রহমান মানিক।
প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানবসভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই চলে আসছে সাম্রাজ্যবাদ ও পররাজ্য দখল। সৈন্য-সামন্ত, অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে যুদ্ধ করে অপেক্ষাকৃত দূর্বল দেশ দখল করে সে দেশের সম্পদ লুন্ঠন করার রেওয়াজ এখন পুরনো । সৈন্য-সামন্ত পাঠিয়ে সর্বাত্নক যুদ্ধের মাধ্যমে অন্য একটা দেশ দখল করে নেয়ার রীতি এখন নেই বললেই চলে। সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টেছে সাম্রাজ্যবাদের কৌশল। টার্গেটকৃত দেশে রাজনৈতিক অস্হিরতা-অরাজকতা সৃষ্টি, তাবেদার সরকার বসিয়ে  ভিন্নমতাবলম্বীদের জেল-জুলুম, হত্যা-গুমের মাধ্যমে নিশ্চিহ্নকরন, শিক্ষা ব্যবস্হা ধ্বংসকরা, অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ও ব্যাংকিং সিষ্টেম ভেঙ্গে দেয়া, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, জনগনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, গনমাধ্যম নিয়ন্ত্রন, নির্বাচন ব্যবস্হা ধ্বংসকরন, শিল্প-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রন, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দূর্বলকরন ও সর্বগ্রাসী গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সেক্টর নিয়ন্ত্রনে নিয়ে অঘোষিতভাবে দেশটিকে কব্জা করে নিয়ে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করার নতুন নিয়মে এখন বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিস্তৃত হচ্ছে।
এভাবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় স্লো-পয়েজনিংয়ের মত সবদিক থেকে এভাবে পঙ্গু করে দিয়ে সে দেশের সম্পদ লুটে নেয়ার পর অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া হয় হতভাগা দেশটাকে। বিগত কয়েক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর প্রতিফলন দেখেছে বিশ্ববাসী। টার্গেট দেশটি নামে মাত্র স্বাধীন থাকলেও প্রকৃত অর্থে একটি ঔপনিবেশিক কলোনীতে পরিনত হয়।
আমাদের নিকটদুরত্বে একসময়ের স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র সিকিম উপরোক্ত নিয়মে সাম্রাজ্যবাদের শিকার হয়ে ১৯৭৫ সালে ভারতের ২২ তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী ভারতের সিকিম হজমের ক্রমানুপাতিক কাহিনী সম্পর্কে আলোকপাত করতেই আজ এ লেখনীর অবতারনা।
অনেক কষ্ট ও ত্যাগের মাধ্যমে সিকিম ইংরেজদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। কিন্তু নিজ দেশের চক্রান্তকারী এবং দুর্বল নেতৃত্বের কারণে সিকিম তাদের স্বপ্নের স্বাধীনতা আবার হারিয়ে ফেলেছে ।
আজ যখন বিশ্বে স্বাধীনতা হারানোর গল্প করা হয় বা উদাহরণ দেয়া হয় তখন সবার আগে ভারতকর্তৃক সিকিম দখলের কথা উচ্চারণ করা হয়।
সিকিম ছিল ভারতের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত তিব্বতের পাশের একটি রাজ্য। সিকিম রাজ্যটির স্বাধীন রাজাদের বলা হত চোগওয়াল। পার্শ্ববর্তী ভুটান ও নেপালের সাথে এই রাজ্যটির প্রথম থেকেই বিবাদ থাকলেও ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরুর পূর্বে সিকিম নেপাল আর ভুটানের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল, কিন্তু ব্রিটিশরা আসার পর তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় সিকিম এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তারা নেপালের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে।
সে সময় সিকিমের রাজা ছিলেন নামগয়াল। ব্রিটিশরা প্রথমে সিকিমের স্বাধীনতাকে সমর্থন জানালেও কিছু দিন পরে তারা তিব্বতে যাওয়ার জন্য সিকিম দখল করে নেয়। ১৮৮৮ সালে রাজা নামগয়াল এই বিষয়ে আলোচনার জন্য ভারতের কলকাতায় গেলে তাঁকে বন্দী করা হয়। ৪ বছর পরে ১৮৯২ সালে ব্রিটিশরা রাজা নামগয়ালকে মুক্তি দেয় এবং সিকিমের স্বাধীনতাকে পুনরায় মেনে নেয়। প্রিন্স চার্লস ১৯০৫ সালে ভারত সফরে এসে সিকিমের চোগওয়ালকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার সম্মান প্রদান করে। সে সময় চোগওয়ালপুত্র সিডকং টুলকুকে উন্নত লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে পাঠানো হয়।
ব্রিটেন থেকে ফিরে সিডকং টুলকু নামগয়াল সিকিমের ক্ষমতায় আরোহণ করেন এবং সিকিমের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশের নিকট থেকে সিকিম তার পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা লাভ করে।
পরবর্তী চোগওয়াল থাসী নামগয়াল সিকিমের ক্ষমতায় আসলে সেই সময়ে (১৯৪৭ সালে)
ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যায় এবং একই সময়ে গণভোটে সিকিমের মানুষ ভারতের বিরুদ্ধে তাদের ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে এবং ভারতের পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু সিকিমকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন।
১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর সিকিমের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ১৯৬৩ সালে সিকিমের রাজা থাসী নামগয়াল এবং ১৯৬৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু মারা গেলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। থাসী নামগয়াল এর পরে সিকিমের নতুন চোগওয়াল (রাজা) হন পাল্ডেন থন্ডুপ নামগয়াল এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী।
নেহেরু স্বাধীন সিকিমের পক্ষে থাকলেও ইন্দিরা গান্ধী সিকিমের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেন নি। ফলে ক্ষমতা গ্রহণ করেই ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সর্বশক্তি নিয়োগ করেন সিকিমকে পুনরায় দখল করার জন্য। প্রাথমিক কূট কৌশল হিসেবে তিনি কাজে লাগান তৎকালীন সিকিমের ক্ষমতালোভী প্রধানমন্ত্রী কাজী লেন্দুপ দর্জিকে। ভারতের কৌশল ছিল লেন্দুপ দর্জিকে ভারতের পা চাটা গোলাম বানিয়ে তাকে দিয়ে সিকিমকে খেলানো। সিকিমের জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা,
রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা,
সিকিমে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি করা, সিকিমের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতের তাঁবেদারি করা,
সিকিমের জাতীয়তাবাদী নেতা ও জনগণকে হত্যা করা, তাদের বন্দী ও নির্যাতন করা, ভারতের জন্য কৌশলে সিকিমের সীমান্ত উন্মুক্ত করা, সিকিমকে ভারত নির্ভর করে দিয়ে সমগ্র বিশ্ব থেকে আলাদা করা, সিকিমের অর্থনীতি ধ্বংস করা সহ বিভিন্ন কৌশল বাস্তবায়নের জন্য ভারত লেন্দুপ দর্জিকে সেখানে গোপনে তাদের দোসর হিসেবে নিযুক্ত করে। লেন্দুপ দর্জি নিজ মাতৃভূমির মায়া-মমতা ও দেশ প্রেমকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজ দেশকে ভারতের কাছে বিক্রয়ের জন্য তাদের তাঁবেদারি শুরু করেন।
এর আগে ১৯৪৫ সালে কাজী লেন্দুপ দোর্জি খাং শেরপা সিকিম প্রজা মণ্ডল নামে এক রাজনৈতিক দল গঠন করে এর সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি সিকিম স্টেট কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকেন। লেন্দুপ দর্জি ১৯৬২ সালে সিকিমের স্বতন্ত্র দল, রাজ্য প্রজা সম্মেলন সিকিম স্টেট কংগ্রেস ও সিকিম ন্যাশনাল পার্টির কিছু দলছুট নেতাদের নিয়ে গঠন করেন নতুন দল সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস (এসএনসি )। গোত্র কলহ,
রাজতন্ত্রের বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিকে সামনে রেখে এ দলের যাত্রা শুরু হয়। এপ্রিল ১৯৭৩ সিকিম জনতা কংগ্রেসও এ দলের সাথে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। লেন্দুপের মতে, এ দল গঠনের উদ্দেশ্য ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করা, জনগণের শান্তি, উন্নতি এবং দেশের উন্নয়ন করা। তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনে তার দল ১৮টির মধ্যে আটটি আসন লাভ করে।
১৯৭০ সালে নেহেরু প্রভাবিত সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেসকে লেন্দুপ দোর্জি ব্যবহার করে সিকিমে ভয়াবহ অরাজকতা সৃষ্টি করে। ১৯৭০ সালের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে লেন্দুপ দোর্জি এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলর পদে নিয়োগ পান। ফলে সিকিমের কৃষি, পশুপালন এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তার দায়িত্বে চলে আসে। ১৯৭২ সালে এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলরের পদ থেকে তিনি অব্যাহতি নেন। ১৯৭৩ সালে সিকিমে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে ভোটের ফলাফলে অসন্তুষ্ট হয়ে সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। সে আন্দোলন তীব্র হয়ে এক পর্যায়ে রাজতন্ত্রের পতন আন্দোলনে পরিণত হয়। সিকিম জনতা কংগ্রেস এবং সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস নামের রাজনৈতিক দল দুটি একীভূত হয়ে একসাথে এ আন্দোলন পরিচালনা করে। এর মধ্যে ভারতের তাঁবেদার লেনদুপ দোর্জির নেতৃত্বাধীন সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পার্লামেন্টের ৩২ আসনের মধ্যে ৩১টি আসনে জয়লাভ করে। এ নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেটের ওপর ভর করে লেন্দুপ দোর্জি নতুন গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতা লাভ করেন। নির্বাচনে জিতে ২৭ মার্চ ১৯৭৫ প্রথম ক্যাবিনেট মিটিং-এ প্রধানমন্ত্রী লেনদুপ দোর্জি রাজতন্ত্র বিলোপ করেন এবং জনমত যাচাইয়ের জন্য গণভোটের সিদ্ধান্ত নেন।
এদিকে ততদিনে নতুন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সিকিমে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে ফেলে। সিকিমের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লেন্দুপ দোর্জি ভারতীয় পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করার এবং স্টেটহুড স্ট্যাটাস পরিবর্তন করার আবেদন জানান। ১৪ এপ্রিল ১৯৭৫ সালে সিকিমে ভারতীয় সেনাদের ছত্রছায়ায় এক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তারা বন্দুকের মুখে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে বাধ্য করে। নির্বাচনের পুরো ঘটনা ছিল সাজানো নাটক। এভাবে সাজানো ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সিকিমে সরাসরি ভারতীয় আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়।
এরপর ৬ এপ্রিল ১৯৭৫ সালের সকালে সিকিমের রাজা যখন নাস্তা করতে ব্যস্ত সে সময় ভারতীয় সৈন্যরা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে এবং রাজাকে বন্দী করে প্রাসাদ দখল করে নেয়। এভাবে ২০ দিন অচলাবস্হায় থাকার পর ২৬ এপ্রিল ১৯৭৫ সিকিম ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। একসময়ের স্বাধীন দেশ সিকিম ১৬ মে ১৯৭৫ সরকারিভাবে ভারত ইউনিয়ন ভুক্ত হয় এবং লেন্দুপ দোর্জিকে নিযুক্ত করা হয় সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী। রাজতন্ত্রের পতনের ফলে সিকিমের ‘চোগিয়াল’ পদের অবসান ঘটে। চীন ছাড়া অন্যান্য জাতিসংঘের বেশির ভাগ সদস্যরাষ্ট্র সিকিমের এ পরিবর্তনকে দ্রুত অনুমোদন করে। ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার সাথে সাথে লেন্দুপ দোর্জির রাজনৈতিক দল ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস দলের সাথে একত্রিত হয়ে যায়। আর এভাবেই ভারতীয় কূট কৌশলের জালে পড়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ভারতের অধীনে চলে যায়।
এখানে মজার বিষয় এই যে, সিকিমের সেনাবাহিনী তাদের রাষ্ট্র রক্ষায় কোনও প্রকার চেষ্টা করেনি, তারা পুরো সময়টায় অলস ঘুমিয়ে ছিল। কারণ, সিকিম সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকট থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ছিল।আর সিকিম সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্র-গেলাবারুদ ও যানবহনও ছিল ভারত থেকে সংগ্রহ করা। সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা ভারত প্রেমী হওয়ায় তারা দেশের ক্রান্তি লগ্নে
নির্বাক-নিস্ক্রিয় দর্শকের দুঃখজনক ভূমিকা পালন করেছিল।
ভারতীয় আধিপত্যবাদের সেবাদাস লেন্দুপ দোর্জিকে নিজ দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার পুরস্কার স্বরূপ ভারত সরকার ২০০২ সালে ভারতের পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত করে। সিকিমের রাজ্য সরকার ২০০৪ সালে তাকে সিকিম রত্ন উপাধি প্রদান করে।
কিন্তু শেষ জীবনে বিশ্বাসঘাতক লেন্দুপ দোর্জি নিজ দেশের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করার ফল পেয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন। ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভারত তাকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে লেন্দুপ দোর্জির এসএনসি পার্টি একটি আসনও লাভ করতে ব্যর্থ হয়। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে লেন্দুপ দোর্জি দেখেন ভোটার তালিকায় তার নিজের নামটিও নেই। নিঃসঙ্গ লেন্দুপ দোর্জি লজ্জা, হতাশা ও অপমানিত অবস্থায় সিকিমের বাইরে তার নিজ শহর কলকাতার কলিমপংয়ে চলে যান এবং সেখানে ২০০৭ সালের ৩০ জুলাই নিঃসঙ্গ অবস্থায় ১০৩ বছর বয়েসে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে
মারা যান। তার মৃত্যু সিকিম বাসীর মনে কোনও সহানুভূতি বা বেদনার উদ্রেক করতে পারেনি এবং তার মৃত্যুতে সিকিমের কেউ সামান্যতম দুঃখবোধ করেনি। উল্লেখ্য, লেন্দুপ দোর্জি জন্ম গ্রহণ করেন ১৯০৪ সালের ১১ অক্টোবর পূর্ব সিকিমের পাকিয়ং এলাকায়। তার পুরো নাম ছিল কাজী লেন্দুপ দোর্জি খাং শেরপা।
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সাবেক পরিচালক অশোক রায়না তার বই ‘ইনসাইড স্টোরি অব ইন্ডিয়াস সিক্রেট সার্ভিস’-এ সিকিম সম্পর্কে লিখেছেন, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭১ সালেই সিকিম দখল করে নেয়া হবে। সে লক্ষে সিকিমে প্রয়োজনীয় অবস্থা সৃষ্টির জন্য আন্দোলন, হত্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে আসছিল। তারা ছোট ছোট ইস্যুকে বড় করার চেষ্টা করে এবং তাতে সফল হয়। তারা সিকিমে হিন্দু-নেপালি ইস্যু সৃষ্টি করে সমস্ত জনগণকে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছিল। ভারতীয় সাংবাদিক সুধীর শর্মা ‘পেইন অব লুজিং এ নেশন’ নামে একটি প্রতিবেদনে লিখেছেন, ভারতের সিকিম মিশনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা RAW.
তারা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সিকিমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছিল।
ক্যাপ্টেন ইয়াংজু লিখেছেন, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বেসামরিক পোশাকে রাজার বিরুদ্ধে গ্যাংটকের রাস্তায় মিছিল, আন্দোলন ও সন্ত্রাস করত। লেনদুপ দোর্জি সমগ্র সিকিম বাসীকে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। গণতন্ত্রের শ্লোগান শুনে সিকিমের সাধারণ জনগণ ভাবতেই পারেনি, এই শ্লোগানের পিছনে প্রতিবেশী দেশ একটি জাতির স্বাধীনতা হরণ করতে আসছে। সিকিমের জনগণকে দ্বিধাবিভক্ত করে ভারত তার আগ্রাসন সফল করেছিল আর এটি করতে তারা সিকিমের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাসঘাতক লেনদুপ দোর্জিকে ব্যবহার করেছিল।
বর্তমানে সিকিম ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য। যার রাজধানী গ্যাংটক। এই রাজ্যে মোট জেলার সংখ্যা ৪টি। সিকিম রাজ্যের মোট আয়তন ৭ , ০৯৬ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে সিকিমের জনসংখ্যা ৬ লক্ষ ১০ হাজার ৫ শত ৭৭ জন। এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮৬ জন। সিকিমের মোট জনসংখ্যার ৬০.৯% হিন্দু, ২৮.১% বৌদ্ধ, ৬.৬% খ্রিষ্টান এবং ১.১% মুসলমান। ভৌগলিক ভাবে সিকিমের পশ্চিমে নেপাল, উত্তর-পূর্বে চীনের তিব্বত, পূর্বে ভুটান এবং দক্ষিণে পশ্চিম বাংলা।
আয়তনে সিকিম গোয়া’ র পর ভারতের দ্বিতীয় সবচেয়ে ছোট রাজ্য এবং জনসংখ্যার দিক থেকে ভারতের সবচেয়ে ছোট রাজ্য। সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক ভারতের অন্যতম একটি পর্যটন শহর।
সিকিমের মাটিতে জন্ম নিয়ে, সিকিমের আলো বাতাসে বেড়ে উঠে নিজ মাতৃভূমি সিকিমকেই আধিপত্যবাদী ভারতের হাতে তুলে দেয়া ইতিহাসের নব্য মীরজাফর কুখ্যাত লেন্দুপ দোর্জি মারা গেছে। কিন্তু তার অশুভ প্রেতাত্নারা এখনো পৃথিবীময় ঘুরে বেড়াচ্ছে মুখ ব্যাদান করে। পৃথিবীতে যেন আর কোন কুলাঙ্গার লেন্দুপ দোর্জি জন্মগ্রহন না করে এবং আর কোন স্বাধীন দেশ যেন সিকিমের ভাগ্যবরন না করে এই হোক আজকের প্রার্থনা। লেন্দুপ দোর্জি দেশমাতৃকার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে দু-দিনের বাদশাহী অর্জন করেছিল। কিন্তু তা স্হায়ী হয়নাই। শেষ জীবনে চরম অবহেলা ও একাকীত্বের মধ্যেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল সে।
আর পলাশীর বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর, জগৎশেঠ, ঘসেটি বেগম ও মীরন প্রমূখদের শেষ পরিনতিও কঠিন হয়েছিল। সারাজীবনের লাঞ্চনা-গঞ্জনা ও অবহেলা শেষে অপঘাতে মৃত্যুতেই তাদের অভিশপ্ত জীবনের যবনিকাপাত হয়েছিল।
উভয় ক্ষেত্রেই দেশ-জাতি ও মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাস ঘাতকতাকারীরা প্রকৃতির প্রতিশোধের শিকার হয়েছিল। দেশমাতৃকা ও জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারীদের জন্য এতে রয়েছে চরম শিক্ষা।
৩০ লক্ষ শহীদের পবিত্র রক্ত ও লাখো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত পূণ্যভূমি স্বাধীন-সার্বভৌম আমাদের বাংলাদেশ। আর কোন বৈদেশিক ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও লর্ড ক্লাইভের দেশীয় প্রেতাত্না মীর জাফর-ঘসেটি বেগম-মীরনের অপচক্র যেন এখানে জন্ম না হয়। ক্ষমতার লোভে দেশ বিক্রয়কারী কোন লেন্দুপ দোর্জিও যেন পৃথিবীতে আর জন্ম না নেয়।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
=========================
আতিকুর রহমান মানিক
ফিশারীজ কনসালটেন্ট ও সংবাদকর্মী,
চীফ রিপোর্টার,
দৈনিক আমাদের কক্সবাজার।
মুঠোফোন – ০১৮১৮-০০০২২০