মাসুদা ভাট্টি চরিত্রহীন নাকি চরিত্রহীনা?

প্রকাশ: ২ নভেম্বর, ২০১৮ ৭:৩৩ : অপরাহ্ন

সিরাজী এম আর মোস্তাক, ঢাকাঃ সম্প্রতি সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি একটি টকশোতে ব্যারিষ্টার মঈনুলকে আপত্তিকর প্রশ্নে বিব্রত করার চেষ্টা করেন। প্রত্যুত্তরে ব্যারিষ্টার মঈনুল বলেন, ‘দুঃসাহসের জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আপনি চরিত্রহীন বলে আমি মনে করতে চাই।’ টকশোর শেষ পর্যায়ে সাংবাদিক মাসুদা চরিত্রহীন শব্দ নিয়ে আপত্তি করলে ব্যারিষ্টার মঈনুল বিস্মিত হন এবং জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কাকে চরিত্রহীন বলছেন? এতে সুস্পষ্ট হয়, তিনি চরিত্রহীন শব্দ দ্বারা সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির নারীত্ব বা চরিত্র বুঝাননি। তাছাড়া বাংলা ভাষাতত্ত্বে চরিত্রহীন শব্দটি পুংলিঙ্গবাচক আর মাসুদা ভাট্টি শব্দটি স্ত্রীবাচক এবং বাস্তবেও একজন ভদ্র মহিলা। চরিত্রহীন শব্দটি কখনো তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে বেপরোয়া আচরণ বা সাংবাদিকতা পেশা বুঝাতে পুংলিঙ্গবাচক (চরিত্রহীন) বিশেষণ ব্যবহার করা যায়। ব্যারিষ্টার মঈনুল তাই করেছেন। তিনি বাংলা ভাষাতত্ত্বে মোটেও অজ্ঞ নন। তিনি মাসুদা ভাট্টির নারীত্ব বুঝালে অবশ্যই চরিত্রহীনা বলতেন। যেহেতু চরিত্রহীন বলেছেন, এতে নারীর অবমাননা হয়নি। এরপরও মাসুদা ভাট্টিসহ কতিপয় নারী ব্যারিষ্টার মঈনুলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিসহ ঐসকল বাদী নারীগণ আদৌ নারী নাকি পুরুষ? তারা কি বাংলা বোঝেননা? নাকি ষঢ়যন্ত্রে মেতেছেন? তাদের ন্যায় বাংলাদেশের বিচারকগণও কি বাংলা ভাষায় অজ্ঞ? তারা চরিত্রহীন শব্দটিকে কিভাবে স্ত্রীলিঙ্গ বিবেচনা করলেন এবং ব্যারিষ্টার মঈনুলকে আটকের আদেশ দিলেন? তাদের উচিত ছিল, বিষয়টি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা। টকশোর মতো কথার বাজারে চরিত্রহীন শব্দের জন্য মামলা ও আটক দূরের কথা, সামান্য প্রতিবাদও বেমানান। মূলত বাংলাদেশে সবকিছুই এমন উল্টোভাবে চলছে। এতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার চরম অবমাননা হয়েছে। আমাদের ভাষাগত অজ্ঞতা ফুটে উঠেছে। অতএব জাতির কাছে প্রশ্ন, মাসুদা ভাট্টি চরিত্রহীন নাকি চরিত্রহীনা?

মাসুদা ভাট্টি মোটেও চরিত্রহীন (পুংলিঙ্গ) নন। অথচ টকশোতে এ একটি শব্দের জন্য ব্যারিষ্টার মঈনুল এখন আটক আছেন। এতো মামুলি বিষয়ে এ ঘটনা অনাকাঙ্খিত। এটি জাতীয় ব্যর্থতাও বটে। জাতি এতোটুকু জ্ঞান রাখেনা যে, মাসুদা ভাট্টির ক্ষেত্রে চরিত্রহীন শব্দটি প্রযোজ্য কিনা। যারা এত মামুলি বিষয় নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা করে, তারা দেশের শত্রু। তারা বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের ন্যায় দেশের ক্ষতি বৈ কল্যাণ করেনা। কতিপয় বিশ্লেষণে দেশমাতার শত্রুদের কর্মকান্ড তুলে ধরছি।

প্রথমে আসি, বাংলাদেশে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রচলিত বিচার নিয়ে। মাসুদা ভাট্টির চরিত্রহীন বৈশিষ্ট্য যেমন উল্টো, তেমনি ট্রাইব্যুনালে প্রচলিত বিচারের ফলও আমাদের জন্য উল্টো। ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক শব্দ থাকলেও তাতে বিচারক শুধুই বাংলাদেশের। আবার ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক শব্দ থাকা সত্ত্বেও তাতে অপরাধী, পাকিস্তানিদের পরিবর্তে শুধুই বাংলাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্থ অসহায় নাগরিকগণ। বাংলাদেশের বিচারকগণ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বসে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের নারকীয় ঘটনাতেও পাকবাহিনীকে অভিযুক্ত করেননি। তাদের বিচারে, ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের গণহত্যাসহ সকল অপরাধ বাংলাদেশের ঘাতক, রাজাকার, আলবদর, আশশামস ও অসহায় যুদ্ধবিধ্বস্থ নাগরিকগণই করেছেন। পাকবাহিনী কোনো অপরাধ করেনি। এভাবে বিচারকগণ নিজের দেশ ও জাতিকে বিশ্বে লান্থিত করেছেন। বিচারে প্রমাণ করেছেন, পাকিস্তানিরা অপরাধী নয়; বাংলাদেশিরাই ঘাতক, যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধী ও তাদের প্রজন্ম। পাকবাহিনীর গণহত্যার দায় পড়েছে, বাংলাদেশিদের ওপর। বিশ্ববাসী এখন ১৯৭১ এর ইতিহাসের পরিবর্তে বাংলাদেশে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়কে সঠিকরূপে গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের নাগরিকগণ বিদেশে গেলে প্রথমেই তাদেরকে ঘাতক, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী প্রজন্ম সন্দেহ করেন, যা পাকিস্তানিদের ক্ষেত্রে করেননা। অর্থাৎ বাংলাদেশে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে প্রচলিত বিচারে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জল ইতিহাস পরিবর্তন হয়ে আমাদের লান্থণা বেড়েছে। প্রসঙ্গত প্রশ্ন উঠেছে, মাসুদা ভাট্টি চরিত্রহীন নাকি চরিত্রহীনা?

এবার কোটা প্রসঙ্গ। সবাই জানে মাসুদা ভাট্টি চরিত্রহীন (পুংলিঙ্গ) নয়, তবুও তা নিয়ে মাখামাখি হচ্ছে। এমনিভাবে কোটাবৈষম্যে দেশমাতার ক্ষতি সত্ত্বেও তা বহাল রয়েছে। সবাই জানে, কোটা দ্বারা একপক্ষ অযোগ্যতা সত্ত্বেও অন্যায়ভাবে সুবিধা লাভ করে আর অন্যপক্ষ যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় দেশমাতার। একজন যোগ্য ব্যক্তি বিশেষ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দেশমাতার যে উন্নয়ন করতে পারেন, একজন অযোগ্য বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোটার মাধ্যমে উক্ত পদে অধিষ্ঠিত হয়ে কখনো তা পারেননা। এতে চুড়ান্ত ক্ষতি হয় দেশমাতার। এ সত্য অনুধাবন করে সরকার সম্প্রতি শুধুমাত্র ১ম ও ২য় শ্রেণীর চাকুরিতে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু বিসিএস ও ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্টসহ অধিকাংশ চাকুরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। এটি কথায় ও কাজে ভিন্নতা। যা মাসুদা ভাট্টির চরিত্রহীন বৈশিষ্ট্যের ন্যায় অবাস্তবতা।

বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত স্বাধীনতাবিরোধী শব্দটিও মাসুদা ভাট্টির চরিত্রহীন শব্দের ন্যায়। ১৯৭১ সালে বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রেখে যুদ্ধকালে যারা ভারতে পলায়ন করেছেন, সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, ভারতের লাল বইয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছেন এবং স্বাধীনতার পর দেশে ফিরেছেন, তারা আজ স্বাধীনতার পক্ষশক্তি বা মুক্তিযোদ্ধা। তাদের তালিকা মাত্র প্রায় ২লাখ। এ তালিকার বাইরে কেউ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃত নন। এমনকি বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চারনেতা, এমএজি ওসমানী ও ৩০লাখ বীর শহীদগণও নন। যেহেতু তারা মুক্তিযোদ্ধা তালিকা বহির্ভূত, তাই তাদের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা বিরোধী শব্দটি অত্যুক্ত নয়। বরং যারা যুদ্ধকালে পাকবাহিনীর বেতনভুক্ত ছিল, তারা আজ মুক্তিযোদ্ধা। যেমন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীর ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বামী প্রয়াত বিজ্ঞানী ড, ওয়াজেদ মিয়াসহ বহু আমলা। অন্যদিকে যুদ্ধকালে অসহায় বাঙ্গালিদের মধ্যে যারা আত্মরক্ষার স্বার্থে দিনে রাজাকারি করেছেন আর রাতে পাকবাহিনীর বিরূদ্ধে লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন করেছেন এবং বিজয় ছিনে এনেছেন, তারাই আজ স্বাধীনতাবিরোধী ও অমুক্তিযোদ্ধা। এভাবে বিতর্কিত শব্দের বহুল ব্যবহার পৃথিবীতে কোথাও নেই। এমনি বাড়াবাড়ি হয়েছে, সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির চরিত্রহীন শব্দ নিয়ে।

সুতরাং সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির চরিত্রহীন ইস্যু নিয়ে বাড়াবাড়ি উচিত নয়। এ প্রসঙ্গে ব্যারিষ্টার মঈনুলের আটকাদেশ সম্পুর্ণ অন্যায়। সরকারের উচিত, অতি দ্রুত তাকে মুক্তি দেয়া। তাঁর বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত সকল মামলা প্রত্যাহার করা। দেশে বাংলা ভাষা শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা। উল্লেখিত অন্যান্য বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাধান করা। এজন্য বঙ্গবন্ধুসহ ১৯৭১ এর সকল নাগরিককে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করা। প্রচলিত ২লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা, প্রদত্ত ভাতা ও সকল সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা। দেশের সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা ও লাখো শহীদ প্রজন্ম ঘোষণা করা। তবেই গড়ে উঠবে, জাতীয় একতা। দুর হবে- সকল অনৈক্য, হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও বাহুল্যতা।

mrmostak786@gmail.com.