রোজার কল্যাণে আত্মা হয়ে ওঠে প্রশান্তিপ্রাপ্ত

প্রকাশ: ১৬ মে, ২০১৯ ১১:৫৭ : অপরাহ্ন

আজ পবিত্র মাহে রমজানের মাগফিরাতের দশকের প্রথম রোজা আমরা অতিবাহিত করার সৌভাগ্য পাচ্ছি, আলহামদুলিল্লাহ। এ জন্য আল্লাহপাকের দরবারে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হয়ে দোয়ায় রত হওয়া উচিত। রোজার মূল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে গিয়ে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন- ‘হে যারা ইমান এনেছ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হলো, যেভাবে তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীগণের জন্য, যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পার’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)। প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ-সবল মুসলিম নর-নারী যাদেরই পবিত্র রমজান লাভের সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে, তাদের উচিত অবজ্ঞা-অবহেলা আর কোনো প্রকার বাহানার আশ্রয় না নিয়ে প্রতিটি রোজা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা। কেননা রমজান এমন একটি মাস, যে মাসের সঙ্গে অন্য কোনো মাসের তুলনা চলে না। পবিত্র কোরআন করিমে বর্ণিত হয়েছে, ‘রমজান সেই মাস যে মাসে নাজিল হয়েছে কোরআন যা মানবজাতির জন্য হেদায়াতস্বরূপ এবং হেদায়াত ও ফুরকান (হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী) বিষয়ক সুস্পষ্ট প্রমাণাদিস্বরূপ। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাসকে পায় সে যেন এতে রোজা রাখে’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)। হাদিসে উল্লেখ রয়েছেÑ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিশ্বাস এবং আন্তরিকতা আর উত্তম ফল লাভের বাসনায় রমজান মাসে রোজা রাখে, তার আগের সর্বপ্রকার পাপ ক্ষমা করা হবে’ (বোখারি, মুসলিম)। হাদিস পাঠে আরও জানা যায়, ‘রোজা ধৈর্যের অর্ধেক আর ধৈর্য ইমানের অর্ধেক। ইসলামি পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রমজানের রোজা স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার সাক্ষাৎ লাভের মাধ্যম হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ স্তম্ভ। আর এ জন্যই মহানবী (স.) হাদিসে কুদসির মাধ্যমে এরশাদ করেছেনÑ সম্মান ও মর্যাদার প্রভু আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের অন্য সব কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা একান্তই আমার জন্য এবং আমি এর জন্য তাকে পুরস্কৃত করব’, রোজা ঢালস্বরূপ। তার নামে বলছি, যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের গন্ধের চেয়েও পবিত্র। একজন রোজাদার দুটি আনন্দ লাভ করে, প্রথমত, সে আনন্দিত হয় যখন সে ইফতার করে এবং দ্বিতীয়ত, রোজার কল্যাণে সে আনন্দিত হয় যখন সে তার প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয় (বোখারি)। পবিত্র কোরআন শরিফ থেকে প্রতীয়মান হয়, আল্লাহতায়ালা ধৈর্যশীলদের বেহিসাব সওয়াব দান করবেন। আর রোজা পালন করার ফলে রোজাদার ধৈর্যের চূড়ান্ত নমুনা পেশ করেন। তাই একজন রোজাদারও আল্লাহপাকের কাছ থেকে অনেক বেশি প্রতিদান লাভ করবেন। মহানবী (স.) আরও বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন, রোজাদার তার ভোগ-লিপ্সা এবং পানাহার শুধু আমার জন্যই বর্জন করে, সুতরাং রোজা আমার উদ্দেশেই আর আমিই এর প্রতিদান’ (মুসলিম)। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (স.) বলেছেন, শয়তান মানুষের ধমনিতে চলাচল করে, তোমরা যদি শয়তান থেকে আত্মরক্ষা করতে চাও তবে রোজার মাধ্যমে তোমাদের ধমনিকে সংকীর্ণ করে দাও। বর্ণনাকারী আরও বলেন, একবার হুজুর (স.) আমাকে বললেন, হে আয়শা! সদাসর্বদা জান্নাতের দরজার কড়া নাড়তে থাকো। জিজ্ঞাসা করলাম হে আল্লাহর রাসুল (স.)! তা কীভাবে? তিনি (স.) উত্তর দিলেন, রোজার মাধ্যমে’ (এহ্ ইয়াউ উলুমিদ্দীন)। মহানবী (স.) আরও বলেছেন, যখন রমজান মাস আসে, তখন জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, আর শয়তানের পায়ে জিঞ্জির পরানো হয়’ (বোখারি)। প্রত্যেক রোজাদারকে গভীরভাবে মনে রাখতে হবে, রোজা আদায়ের অর্থ কতগুলো বিষয় থেকে বেঁচে থাকা ও কতগুলো বিষয়কে বর্জন করা। এর মাঝে বাহ্যিকতার কোনো আমল নেই। অন্য যে কোনো ইবাদত মানবদৃষ্টে ধরা পড়ে কিন্তু রোজা এমন এক ইবাদত যা শুধু আল্লাহই দেখতে পান, যার মূল শিকড় রোজাদার ব্যক্তির হৃদয়ে লুকায়িত তাকওয়ার সঙ্গে সংযুক্ত। মহানবী (স.) বলেছেন, ‘মানুষের হৃদয়ে যদি শয়তানের আনাগোনা না থাকত, তবে মানুষ ঊর্ধ্বজগৎ দেখার দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে যেত। শয়তানের আনাগোনা বন্ধে রোজা হচ্ছে ইবাদত কর্মগুলোর ঢালস্বরূপ।’ একজন ব্যক্তির কেবল অভুক্ত এবং পিপাসার্ত থাকাই রোজার মূল উদ্দেশ্য নয়। কেননা হুজুর পাক (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনোদিন রোজা রাখে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং গোলমাল ও ঝগড়াঝাঁটি না করে, যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা কেউ তার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে তবে তার বলা উচিত, আমি রোজাদার’ (বোখারি)। হুজুর (স.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রাখার পরও মিথ্যা বলা ও খারাপ কাজ করা থেকে বিরত না থাকে তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই’ (বোখারি)। রোজা দ্বারা মানুষ স্বীয় কামনা-বাসনাকে দমন করে নিজকে ফেরেশতাদের মোকাম অতিক্রম করাতে সক্ষম হয় আর এই ক্রমধারায় সে পৌঁছে যায় নাফসে মুৎমাইন্নাহÑ অর্থাৎ প্রশান্তিপ্রাপ্ত আত্মার পর্যায়ে। এ ছাড়া এই রোজার মাধ্যমে আত্মাকে জ্যোতির্ময় করার সুযোগ ঘটে। ইতোমধ্যে আমাদের জীবনের দীর্ঘতম অংশ অবজ্ঞা-অবহেলায় অতীত হয়েছে। কেউ জানি না আর কতটা সময় আমাদের জন্য অবশিষ্ট রয়েছে, হয়তো বা পরবর্তী রমজান আর ফিরে পাব কিনা তাও আমরা কেউ বলতে পারি না আর এটা বলা কারও পক্ষে সম্ভবও নয়। তাই আসুন, নফল ইবাদতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহতায়ালার মাগফিরাত ও নাজাত হাসিল করে নিই। মহান আল্লাহপাক আমাদের সবার রোজা গ্রহণ করে তার মাগফিরাতের চাদরে আবৃত রাখুন, আমিন। য় মাহমুদ আহমদ : ইসলামি গবেষক ও কলাম লেখক