রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ২ বছর পূর্ণ হচ্ছে ২৫ আগষ্ট : ক্যাম্প ঘিরে নানান আয়োজন

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট, ২০১৯ ১:২৫ : অপরাহ্ন

ডেস্ক রিপোর্ট।মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা উখিয়া -টেকনাফের ত্রিশটি শর্রনাথী শিবিরের এগার লাখ রোহিঙ্গার বসবাস।আজ রবিবার তারা এদিনটি গনহত্যা দিবস হিসেবে পালন করবে।দুইবছর পূর্তি হিসাবে ক্যাম্প গুলোতে পালন করবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

২০১৭সালের ২৫আগষ্ট মিয়ানমার সেনা বিজিপি ও উগ্রপন্থী রাখাইন যুবকদের নির্যাতন,অত্যাচার জুলুম,র্ধষন,হত্যা সহ নিপীড়নের কারনে রোহিঙ্গারা এ দেশে পাড়ি জমায়।

মিয়ানমার -বাংলা দেশ সরকার কূটনৈতিক পর্যাযে ব্যাপক আলোচনার পর মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশ সরকারকে আশস্থ করেন।কিন্তু শত চেষ্টার পর ও কোনো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের ফেরত পাঠানো যায়নি।আজ রবিবার ক্যাম্প গুলোতে দোয়া মাহফিল করা হবে রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন।

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি মুসা আলী ও নুরুল আমিন বলেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থি মগদের অত্যাচারে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। আজ রবিবার দুই বছর পার হয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক মহল এই সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। যত দ্রুত সম্ভব আমরা আমাদের মাতৃভূমি মায়ানমারে চাই ফিরে যেতে।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আমির কাশেম ও নবী হোসেন বলেন নেতা আজ ‘রোহিঙ্গা নির্যাতনের দুই বছর।কিন্তু, আমাদের ভাগ্যের কোনও উন্নয়ন হয়নি।উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেডমাঝি আবু তাহের বলেন ক্যাম্প অভ্যন্তরের মসজিদ গুলোতে দোয়া করা হবে।

১৯৮০ সালে আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার পর মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর দমন নিপীড়ন শুরু করে । এর পর নানা অজুহাতে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে বর্বর নির্যাতন।

গত ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সাল থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শুরু করে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর এবং ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করে।মূলত ২০১৭’র আগস্টের পর থেকে ধাপে ধাপে সামরিক প্রচারণা চালিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের রোহিঙ্গাবিদ্বেষী করে তোলা হয়।

ফলে নিপীড়নের মুখে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়। কিন্তু এবার প্রায় ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। নতুন পুরনো মিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংখ্যা এখন ১১ লাখ ১৬ হাজার ৪১৭জন। এর বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রায় তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।

উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্প রোহিঙ্গা মাস্টার মো. আকবর ও রহমান বলেন, নির্যাতিত রোহিঙ্গা জাতিকে আশ্রয় দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি রোহিঙ্গা জাতির মা। তার উদারতার কারণে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসতে পেরেছে এবং হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জত রক্ষা হয়েছে।

তা না হলে নাফ নদীতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষের লাশ ভাসতে দেখা যেত। এতে উখিয়া-টেকনাফবাসীকে ভাইবোন হিসেবে ঘোষণা দেন এবং বাংলাদেশের প্রশাসনের প্রশংসা করেন।

মিয়ানমারের সেনা, পুলিশ, নৌ সদস্যরা রোহিঙ্গাদের যেভাবে হত্যা নির্যাতন করেছে আর বাংলাদেশের সেনাসহ সবধরনের সদস্যরা মুখে ভাত ও আশ্রয় দিয়েছেন। রোহিঙ্গা আবদুল নবী বলেন, রোহিঙ্গা নিধন, ধর্ষণ ও হত্যাকারী মিয়ানমারের সরকারের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের পাশাপাশি নিরাপদ প্রত্যাবাসন করা হউক।

নিযার্তনের মুখে রোহিঙ্গারা ফেলে আসা জমি, বাড়িঘর,ধনসম্পদ, মৎস্য খামার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফেরতের পাশাপাশি মিয়ানমারের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে এলে কোন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আর বসে থাকবে না। সকলে নিজ জন্মভূমিতে ফেরত যাবে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতায় রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নিপীড়ন। এ সব সয্য করতে না পেরে রোহিঙ্গারা বাধ্য হয়ে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষংছড়ির বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসেন।

এই সময় বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ৭ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা। আগের সহ সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে এক বছর কেটে গেল।

এরা উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। তৎমধ্যে উখিয়ায় ২৩টি এবং টেকনাফে ৭টি ক্যাম্প রয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়ায় স্থানীয়দের ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।মায়ানমার থেকে প্রথম রোহিঙ্গা প্রবেশ করে ১৯৭৮ সালে।

এই সময় সাড়ে ৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তখন আন্তজার্তিকভাবে কোন ধরনের আশ্রয় বা সাহায্যের ব্যবস্থা ছিল না। তাই স্বল্প সময়ে বাংলাদেশ-মায়ানমার সরকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা মায়ানমার ফেরত গেলেও দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়ে যায়।

এর পর ১৯৮০ সালে মায়ানমার সরকার আইন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়। ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে প্রায় আড়াই লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

এদের কক্সবাজার জেলায় ১৪টি ক্যাম্প স্থাপন করে আশ্রয় দেয়া হয়। এদের মধ্যে উখিয়া কুতুপালং ও টেকনাফ নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হলেও প্রায় ২১ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় রয়ে যায়।

এদিকে দেশি-বিদেশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় গত বছরের ২৩ নভেম্বর মায়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মায়ানমার কর্তৃপক্ষ সম্মত হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। তবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বার্থ ফিরিয়ে আনতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।,

মায়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের প্রতিবাদে সমাবেশ করেছেন রোহিঙ্গারা।উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের মাঝি মোবারক উল্লাহ বলেন আমাদের রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি, নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকার দিতে হবে এবং গণহত্যার বিচার করতে হবে। আমরা নির্যাতিত কেউ না কেউ বাবা, মা ও বোন হারিয়েছি। তাদের বিচার না পেলে গিয়ে কী করব?

আরেক নেতা বলেন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮৩৪ জন, নিহত হয়েছেন কয়েক হাজার, আগুনে পোড়ানো হয়েছে ৭২৫০০টি বাড়ি, ৯০৬টি মসজিদ ও ৯৫১টি স্কুল। এসবের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা বিশ্ববাসীর কাছে দাবি জানাতে থাকব।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস বা এআরএসপিএইচ, ভয়েস অব রোহিঙ্গা যৌথভাবে তাদের গৃহীত কর্মসূচি পালনের অনুমতি পেয়েছে বলে জানা গেছে। এ দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পগুলোর বিভিন্ন ব্লক মাঝিকে প্রয়োজনীয় ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড সরবরাহ করা হয়েছে।

উখিয়ার ২০টি ক্যাম্প থেকে একই সময়ে ২৫ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ ক্যাম্পের মাঠে সমবেত হওয়ার কথা।

এ দুটি রোহিঙ্গা সংগঠন তাদের দেশি-বিদেশি নেতাদের সমন্বয়ে কর্মসূচির যাবতীয় সরঞ্জামাদির খরচ মেটাচ্ছে বলে জানা যায়। প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে সাদা কাপড় পরে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের নির্দেশ রয়েছে।

বিশাল আয়োজন, ব্যানার, মালামাল, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ইত্যাদির জোগানদাতা ও খরচ বহনকারীরা বরাবরই আড়ালে থেকে যাচ্ছে বলে অনেকের অভিমত।

উখিয়া থানার ওসি মো. আবুল মনসুর বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ২৫ আগস্ট পালন উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পের ইনচার্জরা দেখভাল করবেন। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এখনো এ ব্যাপারে সরকারের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।