সাজেক ভ্যালি, এক নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্র

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারী, ২০১৯ ২:২৪ : অপরাহ্ন

।। রেজাউল করিম চৌধুরী রুমু।।নিউজ বিএনএ ডট কম: সাজেকে সর্বত্র মেঘ, পাহাড় আর সবুজের দারুণ মিতালী চোখে পড়ে । এখানে তিনটি হেলিপ্যাড বিদ্যমান, যা থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায়। এখানে ২৪ ঘণ্টায় প্রকৃতির তিনটা রূপই দেখা মিলে। কখনো খুবই গরম, একটু পরেই হটাৎ বৃষ্টি এবং তার কিছু পরেই হয়তো চারদিকে ঢেকে যায় মেঘের চাঁদরে। মনে হয় যেন একটা মেঘের উপত্যকা। পর্যটকদের জন্য দারুন এক মনমুগ্ধকর স্থান সাজেক।

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে সাজেক ইউনিয়ন। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন, যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। রাঙামাটি জেলার সর্বউত্তরের মিজোরাম সীমান্তে এর অবস্থান । সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা।

এখানে গড়ে ওঠেছে সাজেক ভ্যালি নামে বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। ভৌগোলিক অবস্থান রাঙ্গামাটিতে হলেও যাতায়াতের সহজ পথ হচ্ছে খাগড়াছড়ি জেলা। খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগে ৩ ঘন্টা ।খাগড়াছড়ি শহর অথবা দীঘিনালা হতে জিপ,মোটরসাইকেলে করে সাজেকে যাওয়া যায়।তবে,রাঙামাটি থেকে নৌপথে কাপ্তাই পৌঁছে অনেক পথ হেঁটে সাজেক যাওয়া যায়।

যাত্রাপথে প্রথমেই পড়বে ১০ নম্বর বাঘাইহাট পুলিশ ও সেনা বাহিনীর ক্যাম্প। সেখান থেকে ভ্রমণরত সদস্যদের তথ্য দিয়ে সাজেক যাবার মূল অনুমতি নিতে হবে। সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে পর্যটকদের গাড়িগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে সাজেক পৌঁছে দেয়া হয়। মূলত সাজেকের ভ্রমণার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে বাঘাইঘাট বাজার থেকে সাজেক পর্যন্ত সবগুলো পর্যটকবাহী গাড়িকে নিরাপদে পৌঁছে দেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। দিনের দুইটি নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত সেনা বাহিনী ক্যাম্পের পক্ষ হতে সাজেক যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। পর্যটকদের সর্বাধিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে।

এখানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উঁচুতে রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প। বিজিবি সদস্যদের সুষ্ঠু পরিকল্পনায়, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের কারণে বর্তমান সাজেকের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভম হয়েছে। বর্তমানে সাজেকে ভ্রমণরত পর্যটকদের জন্য প্রায় সকল ধরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সারাবছরই সাজেক যাওয়া যায়।

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বাঘাইহাট বাজারের পাশ দিয়ে চলে গেছে কাচালং নদী।  বাঘাইহাট বাজারের পর গঙ্গারাম মুখ। দু’পাশ থেকে বয়ে আসা দু’টি নদী এক হয়েছে এখানে। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সর্পিল নদী চলে গেছে বহু দূর।

নীল আকাশের নিচে বিশাল সমৃদ্ধ বনভূমির দেখতে পাওয়া যাবে সাজেক ভ্যালির পথে। রাস্তার দুপাশে দেখা যাবে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি ঘর।উড়োবাজার, গঙ্গারামমুখ, নন্দরাম এসব পাহাড়ি পাড়া পেরিয়ে যাত্রাবিরতি দিতে হবে মাচালং বাজারে। পাশের সীমান্তঘেঁষা ভারত থেকে আসা মাচালং নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে ছোটখাটো বাজার। এই এলাকা সাজেক ইউনিয়নের প্রধান কেন্দ্রস্থল। মাচালং বাজারে  জুমের ফসল বিক্রি করেন স্থানীরা।

মাচালং বাজার থেকে সাজেকের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। বন্ধুর পথের দু’পাশেই আকাশচুম্বী পাহাড়ের বুকে দেখা মিলবে বৃক্ষরাজি আর বিচ্ছিন্ন বসতির। সেইসঙ্গে কয়েকটি প্রাকৃতিক ঝর্ণাও চোখে পড়বে।

সাজেকের শুরুতেই চোখে পড়বে রুইলুইপাড়া। এটা সাজেক উপত্যকার মূল কেন্দ্র। রুইলুইপাড়ায় বসবাস করেন লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী। পাড়ার সবগুলো বাড়ির রঙ লাল-সবুজ।

রুইলুইপাড়ায় রাস্তার পাশেই রুইলুই জুনিয়র হাই স্কুল। পাশেই রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প। এখানে দেখার মতো আছে অনেক মনোরোম দৃশ্য।

রুইলুইপাড়ায় বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট আছে। এখানে অল্প দামে প্রায় সব ধরনের খাবার পাওয়া যায় । বিশেষ করে ফল পাওয়া যায় খুব সস্তায়। থাকার জায়গাও পাবেন স্বাভাবিক খরচেই।

সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়-এ যাওয়া যায়। কংলাক হচ্ছে সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। কংলাকে যাওয়ার পথে মিজোরাম সীমান্তের বড় বড় পাহাড়, আদিবাসীদের জীবনযাপন, চারদিকে মেঘের আনাগোনা পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। রুইলুইপাড়ার হেলিপ্যাডের পাশ দিয়ে সোজা উত্তরে একটি রাস্তা চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরে এগোলেই কংলাকপাড়ায় যাওয়া যাবে।

কংলাক আগে মূলত লুসাই ও পাংখোয়া অধ্যুষিত পাড়া ছিল। এখন পাংখোয়া নেই বললেই চলে, কিছু লুসাই পরিবার আছে। আর আছে ত্রিপুরা। কংলাক সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। কংলাকে বিনা সংকোচে যেকারো বাসায় প্রবেশ করা যাবে। এখানকার লুসাই ও ত্রীপুরা অধিবাসিদের ব্যবহার অত্যন্ত নমনীয়।

রুইলুইপাড়া এবং কংলাক পাড়া এই দুটি পাড়ার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে সাজেক। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত রুইলুই পাড়ার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭২০ ফুট। আর ১৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত কংলাক পাড়া। সাজেকে মূলত লুসাই ,পাংখোয়া এবং ত্রিপুরা আদিবাসী বসবাস করে। সাজেকের কলা ও কমলা বেশ বিখ্যাত। সাজেক ভ্যালি থেকে রাঙামাটির অনেকটা অংশই দেখে যায় । তাই সাজেক ভ্যালিকে বলা হয় রাঙামাটির ছাদ।