স্কুলে যৌন শিক্ষার খবর : পরিণতি কী হতে চলেছে!

প্রকাশ: ৩ এপ্রিল, ২০১৯ ৩:১২ : অপরাহ্ন

শরীফ মুহাম্মদ ।। একদিক থেকে দেখলে মনে হয় ভালোই তো, আরেক দিক থেকে দেখলে চমকে উঠতে হয়। অথবা মনে হয়, কিছু বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে, আবার কিছু কিছু বিষয় দেখে মনে হয়, সর্বনাশের শেকড়ই যেন গাড়া হচ্ছে। ৩৫০টি স্কুলে গত পাঁচ বছর ধরে চলা ‘বিশেষ যৌন শিক্ষা’ সম্পর্কিত বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনটি (টেক্সট ও ভিডিও) দেখার পর এমন অনুভূতি হতে পারে সচেতন সবার মাঝে।

২৬ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে জানা যায়, দেশের ৩৫০টি স্কুলে ‘জেমস’ নামের দুই বছর মেয়াদী এই বিশেষ কোর্সটি চালু আছে গত পাঁচ বছর ধরে। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক তহবিল- ইউএনএফপিএ-এর অর্থায়নে এটা চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চালু এই প্রোগ্রামে অচিরেই আরও দুইশো স্কুলকে যুক্ত করা হবে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে চালু এই কোর্সটির ধরন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘পশ্চিমা দেশের বিদ্যালয়ে পড়ানো সেক্স এডুকেশনের আদলে’ এ শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

https://ichef.bbci.co.uk/news/660/cpsprodpb/6BCC/production/_106169572_1.jpg

এখানে কী কী বিষয়ে পড়ানো হয়? যা যা পড়ানো হয় সেসবের পোশাকি শিরোনাম- জেন্ডার সমতা, বাল্যবিবাহ, মাসিক রজঃস্রাব, স্বপ্নদোষ, বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, শারীরিক ও যৌন সহিংসতা, যৌনবাহিত রোগ, জননাঙ্গবাহিত রোগ ইত্যাদি। বোঝাই যায় এর সঙ্গে সাধারণ যৌন সম্পর্ক, যৌনসম্পর্কের ফলাফল, নিরাপদ যৌন সম্পর্কের উপায় ও ঝুঁকি –এসব বিষয়ও আলোচনা থেকে খুব একটা বাদ পড়ে না, পড়ার কথাও না। ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কনডমের ব্যবহার নিয়েও বাচ্চারা স্বাভাবিকভাবে ‘শিক্ষা’ গ্রহণ করছে।

বলা হয়েছে, সামাজিক ট্যাবু ভেঙ্গে যারা এসব শিখছে তারা অন্য শিশু-কিশোরদের চেয়ে যৌন বিষয়ে অনেক বেশি জড়তামুক্ত হতে পারছে। তারা এখন মাসিক, স্বপ্নদোষ, যৌন সম্পর্ক, কনডম –এ জাতীয় শব্দ ব্যবহারে মোটেই সংকুচিত নয়। শিক্ষাটা দেওয়া হচ্ছে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের। আর ছেলে-মেয়েদের একটি কক্ষে বসিয়েই হচ্ছে এসব পাঠদানের কাজ।

এ শিক্ষার ভালোমন্দ নিয়ে এর মধ্যেই নানা রকম প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে এ নিয়ে তর্ক। শুরুতেই সেসব তর্কে যাওয়ার আগে কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে কথা চলতে পারে। এখানে কয়েকটি প্রশ্ন জোরালোভাবে সামনে চলে আসে।

এক. ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের মাঝে এত বিস্তারিত যৌনতা বিষয়ক ‘জ্ঞান’ বিনিময়ের দরকার কতোটুকু? ৯ থেকে ১৪ বছরের যে শিশু বা কিশোর-কিশোরীকে এসব শেখানো হচ্ছে- তার পরবর্তী কৌতূহল প্রবণতার ফল কী দাঁড়াতে পারে? এদের বয়সটা কি বয়ঃসন্ধিকালে ও বয়োপ্রাপ্তির নিশ্চিত বয়স?

দুই. যদি তা-ই হয় তাদের বয়স, তাহলে ১৮-এর আগে বৈধ শারীরিক সম্পর্কে (বিবাহ) আইনের শাস্তিমূলক এত কঠোর বাঁধন কী জন্য রাখা হয়েছে? এবং কেনই বা বিবাহ ভেঙ্গে দিয়ে সেটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে?

https://ichef.bbci.co.uk/news/624/cpsprodpb/14434/production/_106169928_5.jpg

তিন. যৌন বিষয়ে ট্যাবু বা সামাজিক লুকোছাপা ভাঙ্গা আর সাধারণ লজ্জাশীলতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাঝে কি কোনো পার্থক্য নেই? ঐতিহ্যগতভাবে পারিবারিক পরিবেশে যেভাবে কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধির পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন করে দেয়া হয়– সেটা কি অল্প বয়সীদের জন্য এখন আর একদমই প্রযোজ্য নয়? তাদের ভেতরের লজ্জাশীল কোমলতা এই প্রকাশ্য আয়োজনের মাধ্যমে ভাংতেই হবে?

চার. কিছুটা বিস্তারিত পর্যায়ের যৌন সতর্কতামূলক জ্ঞান যদি ছাত্রছাত্রীদের দিতেই হয় সেটা কি দশম শ্রেণির পর থেকে দেওয়া যেত না? মাত্র বয়ঃপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের মাঝে মানবিক কোমলতা ও লজ্জাশীলতা ভেঙ্গে ফেলার পর বাস্তব কৌতূহল প্রবণতা ও অনাহুত ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ শুরু হওয়ার আশঙ্কা কি একেবারেই নেই?

পাঁচ. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিশু-কিশোরদের মাঝে সবিস্তারে যৌনশিক্ষা প্রকল্পের বিরুদ্ধে যেসব আন্দোলন-প্রতিরোধের খবর পাওয়া যায় সেসব কি পুরোপুরি ভিত্তিহীন? যদি কিছুও সত্যি হয়ে থাকে তবে সেসবের কারণটা কী-সংশ্লিষ্টরা কি তলিয়ে দেখেছেন?

আর এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হচ্ছে, যৌন বিষয়ে এ দেশের শিশু-কিশোরদের কোন শ্রেণিভূক্ত ধরে নিয়ে বা মেনে নিয়ে এ জাতীয় যৌন শিক্ষাদানের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে- এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। একটি হচ্ছে, বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকেই কিশোর-কিশোরীরা প্রাকবিবাহ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে এবং সেটাকে স্বাভাবিক মনে মেনে নিতে হবে। এবং এ ক্ষেত্রে দেখার ব্যাপার হচ্ছে, এমনটা করতে দিয়ে তারা যেন কোনো ‘অনভিপ্রেত’ পরিস্থিতির মধ্যে না পড়ে কিংবা দুরারোগ্য কোনো রোগে আক্রান্ত না হয়ে যায়- সেজন্য তাদেরকে ‘নিরাপদ’ যৌনতার উপায়গুলো সম্পর্কে সচেতন করা। যেমনটা করা হয় পশ্চিমের দেশগুলোতে। যদি এই প্রকল্পটার গোড়ার ভাবনাটা এমনই হয়- তাহলে বলতে হবে, অশ্লীলতা, অপবিত্রতা ও অনাচারের একটি ভয়াবহ ক্ষেত্র প্রস্তুতির কাজ চলছে এ্ কোর্সের মাধ্যমে।  আর যদি এসব শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়, যৌন বিষয়ে দশ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের সাধারণ জ্ঞান দান এবং অনৈতিক যৌনচার থেকে যেন কিশোর-কিশোররীরা বেঁচে থাকে সে ব্যবস্থা গ্রহণ- তাহলে বলতেই হয়, সময়ের আগেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি উদ্যোগে এদর জড়ানো হয়েছে। কারণ, কৌতূহলের মাত্রাটা সব শিশু-কিশোরের মাঝে সমান থাকে না। কিছু ‘ঝুঁকিপ্রবণ’ বালক-বালিকাকে সচেতন করতে গিয়ে বহু শান্ত ও লজ্জাশীল কিশোর-কিশোরীদের মনের জগতে ‘নিষিদ্ধ’ একটি হাতছানির বীজ বুনে দেওয়ার খতরনাক কাজটা হয়ে যাচ্ছে এ কোর্সের মাধ্যমে। এর ফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

https://ichef.bbci.co.uk/news/624/cpsprodpb/F614/production/_106169926_2.jpg

বিবিসির প্রতিবেদনটি ইতিবাচক ভঙ্গিতে তৈরি। প্রোগ্রামটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। অর্থ দিচ্ছে জাতিসংঘ। পদ্ধতি পশ্চিমাদের বিদ্যালয়ে যৌন শিক্ষা দানের। এ প্রোগ্রামের বিস্তার ও বিকাশে ভালো কিছু হওয়ার পরিবর্তে ধ্বংস হওয়ার আলামত ও আশঙ্কাই বেশি চোখে পড়েছে। এ দেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ এবং সামাজিকভাবে এখনো অনেক শালীন। আবার এর মধ্যেই বহু ‘যৌন দুর্ঘটনার’ খবর প্রায়ই পত্রিকার পাতায় আসছে। ডাস্টবিনে আর তালাবদ্ধ ট্রাংকে নবজাতকের কান্না এখন প্রায়ই শোনা যায়। এটা কি এ জাতীয় কোর্সের মাধ্যমে বন্ধ হবে? না কি এমন ঘটনা ও খবর আরো বাড়বে –ভেবে দেখা দরকার।

আসলে এসব পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এর চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় যে শিক্ষাটি প্রভাব রাখতে পারে সেটি হচ্ছে ছেলে-মেয়েদের মাঝে দ্বীনের নিরাপত্তা চেতনা জাগ্রত করা। অবৈধ সম্পর্ককে কঠোরভাবে ‘অবৈধ’ হিসেবেই তাদের অন্তরে বসানো এবং ছেলেমেয়ে উভয়পক্ষের মাঝে পর্দার বিধানকে কার্যকর করে তোলা।এটা করা হলে ‘যৌন-অনিরাপত্তা’ এমনিতেই অনেক কমে যেতে পারে। পশ্চিমাদের আদলে বাংলাদেশে ‘যৌনশিক্ষা’ পড়ানোর প্রয়োজন ও সুফল কোনোটাই থাকার কথা নয়।