আজ আমার আম্মুর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী

প্রকাশ: ২৩ মে, ২০২০ ১২:৫২ : অপরাহ্ন

বার্তা পরিবেশক

“মা” অনেক বড় শব্দ আমি বুজেছি ২০১৬ সালে ২২ মে শবে বরাত এর রাতে ।
#আজকে আমার আম্মুর #৪র্থ_মৃত্যু_বার্ষিকী আল্লাহ্‌ আমার আম্মুকে আম্মুর সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিন এবং কবরের আজাব থেকে মুক্তি দান করুন । হে আল্লাহ্‌ তুমি আমার আম্মুকে তোমার মেহেমান হিসাবে কবুল করে নাও। তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। সবাই আমার আম্মুকে ক্ষমা করবেন এবং আমার আম্মুকে যেন আল্লাহ্‌ জান্নাতবাসী করে সেই দোয়া করবেন ।
আমিন।
আম্মুর নাম মরহুমা তাহেরা আক্তার চৌধরি
স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ মাসুদ কুতুবি আমার বাবা।
#আজও মনে পরে ২০১৬ সালের ২২ মে রাত ও ২৩ মের কথা সৃতির পাতা থেকে।
আমরা সাধারণত শবে বরাত আর লাইলাতুল কদর এর বিশেষ রজনীতে বিভিন্ন মসজিদে প্রায় রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত নামাজ এবং কবর জিয়ারত করে বাসায় আসি। এখন যে পরিমাণ গরম পড়তেছে ২০১৬ গরম আরও বেশি পরছিলও । আমার আম্মু প্রেশার আর ডায়বেটিস এর রোগী। আল্লাহর কি ইচ্ছা আমি রাত ১০ টার দিকে নামাজ পড়ে সাথে আমার সহকর্মী কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বন্ধু প্রভাষক ফিরোজ আহমেদ হিরো এবং আমার আরেক বন্ধু ফিরোজ উদ্দিন নিয়া বাসায় আসি । আমি আসার সাথে সাথে আম্মু বলল সুলতান আসছে নাকি ওকে ডাক। আমি ফিরোজদের হালকা আপ্যায়ন করে আম্মুর কাছে গেলাম দেখি আম্মুর প্রেশার বাড়েছে। আমি তাড়াতাড়ি আমার ফুফাত ভাই ডাঃ শাহীন আব্দুর রহমা ভাইকে ফোন করলাম তিনি তখন মেডিকেল অফিসার ছিল কক্সবাজার সদর হসপিটালে বর্তমানে RMO কক্সবাজার সদর মেডিকেল ,কক্সবাজার। শাহীন ভাই বলল আসতেছি । এর মধ্যে বাবা পাশে ফার্মেসি থেকে গ্রামীণ ডক্টর দীপঙ্করকে ডাকেন তিনি সব দেখে বলেন আপনারা হসপিটালে নিয়ে যান। মেঝ ভাই চট্রগাম চাকরী করত তিনি আল্লাহর কি ইচ্ছা রাত ১০ টার দিকে কক্সবাজার চলে আসে । বড় ভাইও বাসায় তাড়াতাড়ি চলে আসে । আমি আর বাহির না হয়ে বন্ধুদের বলি আম্মুর একটু প্রেশার বাড়ছে দোয়া করিও কে জানতও এই ডাক হবে শেষ । আরিফ আমাদের সবার ছোট ভাই সেও বাসায় ।
মাগরিবের পরও আমি ,আরিফ ,আব্বু আর বড় ভাবী একসাথে পিয়াজু আর ডিম খাই আম্মু রাতে কি কি খাব তা বলে দিছে আবার বড় ভাই ব্যাংক থেকে আসার পর কি খাবে তাও বলে দিল।
আমি ওই দিন একদম টিক রাত ৮ টার দিকে নামাজে যাই কেন জানি মন মানতেছেনা ।
শাহীন ভাই আসার পর প্রেশার আর ডায়েবেটিস চেক করার পর ২ টা ঔষধ দিল । ঔষধ খাওয়ানোর পর আম্মু একটু ডায়নিংয়ে বসল। আম্মু একটু ঘুম ঘুম আসছিল তাই শাহীন ভাই বলল মামী ঘুমালে প্রেশার কমে যাবে।
তারপর আম্মু উঠে ঘুমাতে যায় সাথে মেঝ ভাবী ধরে নিয়ে যায় আম্মু আমাকে ইশারায় ডাকে আমি দুষ্টামী করি মেঝ ভাবীর শক্তি আছে পারবে কিন্তু আম্মু আমার হাত ধরে বিছানায় যায় শুয়ে দিবার পর আমাকে বলল আরিফকে ডাক । আরিফ আম্মুর ডান পাশে আর আমি বাম পাশে তখন আম্মু বড় বড় দুইটা নিঃশ্বাস নেয়। তখনও আমি বুজিনাই এই ডাক আমার আম্মুর শেষ ডাক। ডাঃ শাহীন ভাই তখনও আমাদের গেইট পার হয়নি । আমি তাড়াতাড়ি গেলাম আর বললাম।
শাহীন ভাই বলল তাড়াতাড়ি ডিজিটাল হসপিটালে নিয়া আস। তখন রাত ১১.১৫ হবে টমটম খুঁজাখুঁজি করছি টিক তখন মনে হল বন্ধু সাগর এর কথা ও আমাদের ২য় তলায় থাকে বাড়ির মালিকও বটে আমি গিয়ে বললাম আম্মু খুব অসুস্থ টমটম পাইনি ও বলল আমি গাড়ির চাবি নিয়া আসছি তুই আন্টিকে নিয়ে আয়। আমি এক লাফে গেলাম বন্ধু তার গাড়ি নিয়া আমার আম্মু সাথে আমি ও আরিফ পিছনে সামনে আব্বু বসল ।
ডিজিটাল হসপিটালে জরুরী বিভাগে নিচ তলায় রুমটাতে রাখার পর আমি আম্মু হাত ধরে আছি আরিফও আছে আর বাইরে সবাই। শাহীন ভাই বলল ECG করতে । তার ECG Report দেখে শাহীন ভাই বলল শেষ মামী আর নেই আমি বুজিনাই দেখি বাহিয়ে দেয়াল এর পাশে বড় ভাই কান্না করছে । আমার আম্মু ১১.৩০ থেকে ১২.৩০ এর মধ্যে ইন্তেকাল করেন। একে একে সবাই আসল আমার আর কিছু মনে নাই আমার মোবাইল আরিফ এর কাছে ছিল শুধু এইটুকু মনে আছে আরিফকে বলেছিলাম ফিরোজকে একটা কল করার জন্য। আব্বু,বড় ভাই আর ফেইজবুক এর কল্যাণে রাতে আমাদের বন্ধুরা বাসায় আসে অনেকে । অনেক বন্ধু পোস্ট দিয়েছিল । ২০১৬ সালের আজকের এইদিনে ২৩ মে দুপুর ২টায় জানাজা হয় কেন্দ্রীয় ঈদগায় মাঠে এর পর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে আম্মুকে দাফন করলাম।
কিছু বিষয় আমাকে এখন খুব নাড়া দেয়! ২২ মে রাতে যখন সবাই মিলে সিদ্বান্ত নেওয়া হল ২৩ দুপুর ২.১৫ জানাজা হবে কারণ আমাদের কিছু আত্মীয় চট্রগ্রাম , কুতুবদিয়া ও মাতারবাড়ি থেকে আসবে তাই।
শবে বরাত তাই কাফনের কাপড় এর জন্য আমি আর বড় ভাই গেলাম দেখি দোকান সব বন্ধ । আমরা বড়বাজার পৌরসভা মার্কেটের ওই খানে গেলাম দেখলাম এক মুরব্বি বসে আছে । বড় বলল কাফনের কাপড় আছে ওই লোকটি বলল আছে , আমি তো আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছি এই বলে দোকান খুলে কাফনের কাপড়ের সেট দিলেন এবং বললেন এইখানে সব আছে। আমরা লোকটিকে টাকা দিয়ে চলে আসলাম।
মহিলার জন্য মাইকিং করা যায়না তাই আমি আমার বন্ধু সাগর এর গাড়ি করে লাইট হাউস ,কলাতলী, ৬ নং সহ বিভিন্ন মসজিদে ফজরের আগে ইমামদের বলে আসি আমার আম্মুর মৃত্যু সংবাদ বলার জন্য।
আব্বু ও অনন্যরা ফোনে জানিয়ে দেয় আম্মুর মৃত্যু সংবাদ।
বাসায় ঐ দিন আমাদের বন্ধু ,বিভিন্ন জায়গা থেকে আত্নীয়-স্বজন আসে ,আব্বু ও আমাদের পরিচিতজন আসেন । অনেক বন্ধু চট্রগ্রাম থেকেও আসেন কিন্তু আমি তখন ঘোরের মধ্যে ছিলাম । ২৩ শে মে সোমবার ছিল যোহরের নামাজের পর আমরা ২টা দিকে ঈদগাহ মাঠে আম্মুকে বহনকারী গাড়ি নিয়ে যাই ২.১৫ টা এর সময় জানাজা পড়া হয় । জানাজা শেষে কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন ও জিয়ারত শেষে আমরা ৪ টা নাগাত বাসায় আসি। এসে দেখি সব শেষ আম্মু আর নাই ! আমার তখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা!
আমার চোখর উপর আমাদের বাসায় আমার দাদা আর আমার আম্মু ইন্তেকাল করেন। কিন্তু দাদার সময় এই হারানো ব্যথা আমি অনুভব করিনাই। আমি আমার আম্মুকে হারিয়েছি আজকে ৪ বছর এই ৪ বছরে অনেক কিছু হয়েছে কিন্তু আমি আম্মুকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারিনাই । আমার মনে হয় আম্মু আমাকে বলছে সুলতান একটু প্রেশার চেক কর তো , এইখানে একটু বস বাহিরে এত কি ? আরিফ আসছে নাকি দেখ ! আরও কত কথা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখ আব্বু দ্বিতীয় বিয়ে করেন আসুস্থার কারনে , ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল আমি বিয়ে করি , ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি বড় ভাই দ্বিতীয় সন্তানের বাবা হন “ইকরা বিনতে হাসান” , ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল মেঝ ভাই প্রথম সন্তানের বাবা হন “সামিহা বিনতে হোসাইন” এবং ২০১৯ সালে ২৭ মে আমি প্রথম সন্তানের বাবা হই। এখন আমার আব্বুর প্রথম নাতী আকিল আল হাসান সহ চার নাতী-নাত্নী ,তিন পুত্র বধু ও আব্বুর দ্বিতীয় বধুকে নিয়ে খুব আনন্দে আছে কিন্তু আম্মুর অবদান ১ সেকেন্ডের জন্য ভুলা যায়না । আমাদের এই শুন্যতা কোনদিন পূরণ হবেনা । আম্মু আদেশে আমরা সবাই আব্বুর সাথে আছি। আব্বু আমাদের বট বৃক্ষ শুধু ছায়া দেয়।
আমার বুদ্ধি হবার পর থেকে আম্মুকে যত দেখি তত অভাগ হই ।
আম্মু ত্যাগ আল্লাহ্‌ যেন কবুল করে নেয় । আল্লাহ্‌ আম্মুর সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়ে ও কবরেরে আজাব থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতি পরিবেশ করে দাও আম্মুর কবরকে। আল্লাহ্‌ আম্মুকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন ।
আমিন।
‘হে আল্লাহ, আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সে সকল ভাইদেরও ক্ষমা করে দিন, যারা দীন ও ঈমানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার লাভ করেছেন এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি সামান্যতম বিদ্বেষও রেখো না; হে আমাদের পরওয়ারদিগার, নিশ্চয়ই আপনি দয়াদ্র ও পরম দয়ালু।
(সূরা হাশর : ১০)।