রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রয়োজন হতে পারে সামরিক হস্তক্ষেপ

প্রকাশ: ২৯ জুলাই, ২০২০ ৩:২০ : অপরাহ্ন

ইয়েল ল’ স্কুল ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বার্মায় মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে বলে প্রমাণ পায়। এরপর ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশ, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে আশ্রয় নেয়। ৪ লাখ শিশু সহ লাখ লাখ রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসার আগে বার্মিজ সামরিক বাহিনী ২০১৬ সালে গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালানোর মহাযজ্ঞ আরম্ভ করে।
এই অন্যায়ের প্রতিকার দৃশ্যত কঠিন হয়ে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবরোধ বার্মাকে আরও চীনের দিকে ঘেঁষতে বাধ্য করেছে। এখন পর্যন্ত ‘স্ট্যাটাস-কো’ বা বিদ্যমান অবস্থা হলো শিবিরে শরণার্থীরা গাদাগাদি করেই থাকুক, যার জন্য প্রতি বছর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গুনতে হচ্ছে ১০০ কোটি ডলার, আর বাংলাদেশকে ৩৬০ কোটি ডলার। দায়ীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে বার্মা আরও মানবাধিকার লঙ্ঘণ করে চলছে।

সামরিক বল প্রয়োগের বিষয়টিকে অবাস্তবসম্মত হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সম্ভবত এমনটা অযৌক্তিক। অতীতে সামরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গণ-হত্যাযজ্ঞ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৯ সালে যখন কসোভোর আলবেনিয়ানদের গণহত্যা প্রতিরোধে ন্যাটো সার্বিয়ার বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে। ৩ মাস পর সার্বিয়া ঠিকই ১৫ লাখ আলবেনিয়ানকে ফেরত নিতে সম্মত হয়। এখনও ৪ হাজার ন্যাটো সৈন্য কসোভোয় মোতায়েন আছে, যারা এই সংঘাতে বিবাদমান উভয় পক্ষের বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষিত করে চলেছে।
বলপ্রয়োগের কারণ
আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা যদি কিছুটা হলেও বজায় রাখতে হয়, তাহলে রাষ্ট্র-পর্যায়ে অন্যায়কারীরা যারা আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ভয়ানকভাবে লঙ্ঘণ করে তাদের অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। কোনো দেশকে যদি গণহত্যা করে পার পেতে দেয়া হয়, তাহলে অন্যরা উৎসাহী হবে। আসবে আন্তর্জাতিক বিশৃঙ্খলা। বাস্তবিকভাবে চিন্তা করলেও চীন ও ইসলামি চরমপন্থার ক্রমবর্ধমান প্রসার রোধ করাটা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের আওতায় পড়ে। বাংলাদেশ-বার্মা সীমান্ত লাগোয়া ৩০টি শরণার্থী ক্যাম্পে অন্তরীন রোহিঙ্গারা ক্রমেই ইসলামি উগ্রবাদীদের হাতে মৌলবাদে দীক্ষিত হচ্ছে। শিবিরগুলো সফর করেছেন এমন দু’টি সূত্র এমনটা জানিয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অন্তর্ভূক্তকরণ আবার বাংলাদেশের ব্যালট বক্সে প্রভাব ফেলবে, যা হয়তো মধ্যপন্থী আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন পাল্টে যেতে পারে।
রোহিঙ্গা ভোটাধিকার দিলে তারা ইসলামপন্থী বিএনপি বা দলটির ছোট মিত্র জামায়াতে ইসলামির প্রতি সমর্থন দেবে, এমন সম্ভাবনাই বেশি। বিএনপি চীন, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ। জামায়াত সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট। বিএনপি ২০২৩ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জিতলে ও শরণার্থী শিবির খুলে দিলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত, যাদের দিকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের শাসনাধীন বাংলাদেশ বেশি ঝুঁকে, তাদের জন্য দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
রক্ষা করার দায়িত্ব
এশিয়ায় গণতন্ত্র সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। কেননা, চীনের সাথে যেসব দেশই ঘনিষ্ঠ হয়, তারা গণতন্ত্র থেকে আন্তর্জাতিক ধারাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। কাছে নিয়ে যায় এমন এক বিশ্বের দিকে যেখানে চীনের স্থায়ী উত্থানের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। তবে এই দেশগুলোর একটি মানবিক দায়িত্বও রয়েছে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের শিকার মানুষকে রক্ষা করার।
যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গাদের নিরাশ করেছে, তারপরও এমন আন্তর্জাতিক অবিচারকে সঠিক পথে আনার সময় চলে যায়নি। খুব কম দেশই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ সমাজে স্বাগত জানাবে। আর বাংলাদেশ সবচেয়ে কাছের দেশ বলে দেশটির ওপরই এককভাবে সব দায় বর্তানো উচিৎ নয়। বার্মার প্রতিবাদ সত্ত্বেও, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নয়। তারা বার্মার রাখাইন রাজ্যের আদিবাসী।
অতএব, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে এমন একমাত্র বাস্তবসম্মত ও মানবিক প্রতিক্রিয়া হলো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা ভূখণ্ড ও বাড়িঘর স্ব-ইচ্ছা ও মর্যাদার ভিত্তিতে পুনরুদ্ধার করা।
শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করেন ও রোহিঙ্গা শিবিরে গেছেন এমন একজন সামাজিক উদ্যোক্তা স্যামিয়ের মনসুর মনে করেন, এই পূর্বশর্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন যে, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় বার্মায় ফেরাতে উৎসাহিত করতে হলে ‘নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও টেকসই গৃহায়ন’ প্রয়োজন হবে।

সূত্র মানবজমিন।