জামায়াত চালাচ্ছেন দুই ‘জাসদ’ নেতা

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১২:১৭ : পূর্বাহ্ন

ঢাকা  : রাজনীতির সুনসান ময়দানে দম নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। গোছাচ্ছে বিপর্যস্ত সংগঠন। টার্গেট সংগঠনকে শক্তিশালী করা। ইতোমধ্যে সংগঠনের কান্ডারি  নির্বাচিত করেছেন। ডা. শফিকুর রহমানকে ভোটে নির্বাচিত করা হয়েছে সংগঠনের আমির হিসেবে। তিনিই এখন দলীয়প্রধান। আর আমির তার সাংগঠনিক ক্ষমতা বলে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারকে নিযুক্ত করেছেন সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে। তার আগে পরামর্শ নিয়েছেন শূরা কমিটির। তিনি আমিরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী ও বার্তাবাহক।

জামায়াতের শীর্ষ পদের এই দুই নেতাই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমকারী জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করছেন। দলবদল করে দুজনেই জামায়াতের রাজনীতিতে যোগ দেন। সংগঠনটির নয়া দুই কান্ডারি ডা. শফিক ও মিয়া গোলাম পরওয়ারের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে বিচার-বিশ্লেষণ।

এ প্রসঙ্গে জাসদের (ইনু) দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ডা. শফিকুর রহমান ও মিয়া গোলাম পরওয়ার নিজেদের জাসদের লোক দাবি করছেন। কিন্তু আমাদের কাছে তাদের (জাসদ) সম্পর্কিত কোনো তথ্য নেই। বরং ১৯৮৯ সালে সিলেটে জাসদ ছাত্রলীগের মনির-তপন-জুয়েলকে হত্যার মাধ্যমে জামায়াতের যে উত্থান ঘটে সেই উত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন শিবিরের শফিকুর রহমান। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদের দূরত্ব তৈরি করতেই তাদের এমন দাবি বলে মনে করছেন সাজ্জাদ হোসেন।

এদিকে দীর্ঘ আড়াই মাসে এই দুই নেতা নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের ভেতরে-বাইরে চলছে নানামুখী আলোচনা। অর্ধডজন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সংগঠনের ভোটার ও নেতাকর্মীরা। অবশ্য সংগঠনটির গঠনতন্ত্র মতে, প্রশ্নের জবাব চাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। আর নেতা হওয়ার খায়েশ বা পদপ্রত্যাশা করাটা একধরনের ‘অপরাধ’র শামিল। যে কারণে প্রশ্নগুলো নেতাকর্মীদের মগজেই শুকাচ্ছে।

অপরদিকে আমিরের বিরুদ্ধে আছে আপসকামিতার। তিনিই নির্বাচিত করেছেন প্রিয়ভাজন সেক্রেটারি জেনারেল। যা স্বজনপ্রীতি বলে চাউর রয়েছে।

সারা দেশে জামায়াতের প্রায় ৪৫ হাজার শপথধারী সদস্য বা রুকন আছেন। তারা গত ১৭ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত আমির পদে ভোট দেন। পরদিন রাতে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে জামায়াত জানায়, ডা. শফিকুর রহমান আমির নির্বাচিত হয়েছেন। শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে আমি​র পদের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কৌশলে প্রভাব বিস্তার করার কথা উঠেছে।
ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই নেতাকর্মীদের প্রশ্ন শেষ দিন কত ভোট পড়েছিল, কখন ব্যালট ঢাকায় পৌঁছাল, কখন গণনা শেষ হলো, এত দ্রুততার সঙ্গে কেনই-বা ফল ঘোষণার প্রয়োজন হলো?

জামায়াতের নেতাকর্মীদের একটি অংশ বলছে, এবার আমির পদে প্রার্থী নির্বাচনের প্রথম ধাপে তিন সদস্যের ‘আমির প্যানেল’ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ছিল-আছে। সদ্য সাবেক আমির মকবুল আহমাদকে প্যানেল থেকে কৌশলে বাদ দেওয়া হয়। তিনি শারীরিক অসুস্থ বলে নির্বাচনের আগে থেকেই দলের ভেতরে প্রচার চালানো হয়। মকবুল আহমাদের অনুপস্থিতিতে শফিকুর রহমানকে আমির ঘোষণা করা হয়। ওই সময় ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরব ছিলেন মকবুল আহমদ।

অতীতে জামায়াতের আমির নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, প্যানেলে যিনি ১ নম্বরে থাকেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই আমির হন। এবারের প্যানেলে ডা. শফিকুর রহমানের নাম ১ নম্বরে ছিল।
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্যরা গোপন ভোটে তিন সদস্যের ‘আমির প্যানেল’ নির্বাচন করেন।

এবার এই প্যানেলে ছিলেন, দলের সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান এবং দুই নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান ও মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাদের মধ্যে সবার সিনিয়র ছিলেন মুজিবুর রহমান। শফিকুর রহমান ৬ ভোট বেশি পেয়ে প্যানেলে ১ নম্বরে আসেন। যে ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।

দলে আলোচনা আছে, মজলিশে শূরার নারী সদস্যদের ভোটে শফিকুর রহমান আমির নির্বাচনে এগিয়ে গেছেন। আগে মজলিশে শূরার নারী সদস্যরা শুধু আমির নির্বাচনে ভোট দিতেন, কিন্তু তিন সদস্যের আমির প্যানেল নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার ছিল না।

এবার শফিকুর রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নারী সদস্যদের এই ভোটাধিকার দেওয়া হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, জামায়াতের মহিলা বিভাগ তত্ত্বাবধান করেন দলের আমির মকবুল আহমদ। তিনি ‘অসুস্থ’ বলে এ দায়িত্ব পালন করতেন শফিকুর রহমান। যদিও মকবুল আহমদ ‘অসুস্থ’ নাকি তাকে ‘অসুস্থ’ বলে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়; এ নিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন আছে।

এদিকে গঠনতন্ত্রমতে, জামায়াতে মূল ক্ষমতা হচ্ছে আমিরের। সেক্রেটারি জেনারেলের কাজ হচ্ছে তার কথামতো দায়িত্ব পালন করা। আমির সরাসরি নির্বাচিত কিন্তু সেক্রেটারি জেনারেল সরাসরি নির্বাচিত নন, তাকে আমির মনোনীত করেন। এক্ষেত্রে আমিরকে শূরার কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। গত ২৬ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হয়েছে সেক্রেটারি জেনারেলের নাম। যে ফলাফলও প্রকাশ করা হয়নি।

সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদের নেতৃত্ব নিয়ে মুখ খুলতে চান না। তবে জামায়াতের রাজনীতিঘনিষ্ঠ লেখক শাহ আবদুল হান্নান গণমাধ্যমকে জানান, জামায়াতে কেউ কোনো পদের জন্য চেষ্টা করেন না, তদবির করেন না। ব্যক্তিবিশেষের আগ্রহ প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। যদি কেউ আগ্রহ দেখিয়ে থাকেন, তাহলে জামায়াতের রাজনীতিতে তিনি অপরাধী।

কে এই শফিকুর রহমান : ডা. শফিকুর রহমান ছাত্রাবস্থায় জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন এবং ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগে যোগদান করেন। ১৯৭৩-৭৫ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রথম সারির সৈনিক হিসাবে জাসদ ছাত্রলীগের সিলেট শহর শাখার গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।

১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করেন। সিলেট মেডিকেলে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি প্রথমে মেডিকেলের শিবিরের সভাপতি ও পরবর্তী সময়ে সিলেট শাখার সভাপতি হন। ১৯৮৪ সালে মূল দল জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করে তিনি সিলেটের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১০ সালে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ারও জাসদসংশ্লিষ্ট : অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ১৯৭৪ সালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগে যোগদান করে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে ছাত্র থাকাবস্থায় জামায়াতের সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করেন। পর্যায়ক্রমে ছাত্রশিবিরের খুলনা মহানগরীর সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত খুলনা মহানগরে জামায়াতের আমির এবং ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির নির্বাচিত হন।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৫ (ফুলতলা-ডুমুরিয়া) আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই আসনে ১৯৯১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হন।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ২০-দলীয় জোট থেকে একই আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন।

কিন্তু নির্বাচনের দিন তিনি নির্বাচন বর্জন করেন। গোলাম পরওয়ার ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯ সালে খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার শিরোমণি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।