স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর আগ্রহ কম কেন?

প্রকাশ: ৪ জানুয়ারী, ২০২০ ১:২৩ : অপরাহ্ন

ন্যাশনাল ইসলামী ডেস্ক।

নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১০টি দল ধর্মভিত্তিক। সংসদ নির্বাচন নিয়মিত অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই দলগুলোর অংশগ্রহণ খুব কম। যার রেশ পড়েছে আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনেও। একমাত্র ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনও ইসলামি দল গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচনে প্রার্থী দেয়নি। এমনকি কাউন্সিলর পদেও নিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক দলের সমর্থনে কোনও প্রার্থী নেই।
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে পেশীশক্তি ও নির্বাচনি ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক বিষয়টি জোরালো থাকায় স্থানীয়ভাবে ইসলামি দলগুলোর কেউ প্রার্থী হন না। একইসঙ্গে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার সংকটকেও দায়ী করেছেন কোনও কোনও নেতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা দিনে-দিনে ভঙ্গুর হয়ে গেছে। অর্থের প্রভাব, সরকার ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর কাছে নির্বাচন একটি প্রহসন। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রধানত দলীয়ভাবে হওয়ার পর থেকে বাকি দলগুলোও বড় দুতিনটি রাজনৈতিক দলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘সাংগঠনিক রাজনীতিতে দুর্বলতার কারণে ইসলামি দলগুলোর প্রার্থী সংকট রয়েছে। এ কারণে জাতীয় নির্বাচনে বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট করে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে দূরে থাকে তারা। সাম্প্রতিক যেসব নির্বাচন হচ্ছে,সবগুলোতেই টাকার প্রভাব চোখে পড়ছে।’ এরপরও ধর্মভিত্তিক দলগুলো কাউন্সিলর পদে প্রার্থী দিতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথাও শোনালেন বদিউল আলম মজুমদার।
নির্বাচন কমিশনে ৩৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ১০টি দল ধর্মভিত্তিক। এগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (নিবন্ধন নং ০১৯), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (নিবন্ধন নম্বর ০২০), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (নিবন্ধন নম্বর ০২৩), জাকের পার্টি (নিবন্ধন নম্বর ০১৬), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (নিবন্ধন নম্বর ০৩০), ইসলামী ঐক্যজোট (নিবন্ধন নম্বর ০৩২), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (নিবন্ধন নম্বর ০৩৩), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (নিবন্ধন নম্বর ০৩৪), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (নিবন্ধন নম্বর ০৩৫) ও খেলাফত মজলিস (নিবন্ধন নম্বর ০৩৮)। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন স্থগিত আছে জামায়াতে ইসলামীর। তবে দলটির নেতাকর্মীরা নিয়মিত স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।
ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ দাবি করেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের অংশগ্রহণ রয়েছে। বিগত কয়েক বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা, ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলা, ফুলপুর উপজেলার বিভিন্ন পদে নির্বাচনে অংশ নেন ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থীরা।
খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী জানান, তার দল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়। মজলিসের উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান তিন জন। খুলনার রূপসা, মানিকগঞ্জ সদর, বালাগঞ্জ উপজেলায় দলীয় প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। এছাড়া, উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় প্রার্থীরা নির্বাচন করেছে সিলেটের প্রায় ১০টি জায়গায়। প্রার্থীরা গড়ে আড়াই-তিন হাজার ভোট পেয়েছেন। কারও জামানত বাজেয়াপ্ত হয়নি।
২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের কোনও মেয়র প্রার্থী নেই। কাউন্সিলর প্রার্থীও থাকবে না। আমরা ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের সমর্থন দেবো।’
১৪ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী বলেন,‘ঢাকা সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই জোটের প্রার্থী।’ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্বে তরিকতের অংশগ্রহণ রয়েছে বলে দাবি করেন রেজাউল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন যেন দলীয় প্রতীকে না হয়। এটা নিয়ে ১৪ দলীয় জোটে প্রস্তাব দিয়েছি।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহ-সভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসূফী জানান, ঢাকা সিটি ভোটে কাউন্সিলর পদে জমিয়ত সমর্থিত কোনও প্রার্থী নেই। বর্তমানে জমিয়তের দু-তিন জন ভাইস চেয়ারম্যান আছে বলে দাবি করেন ইউসূফী।
তিনি বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতির পর এই সরকার বা এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনও নির্বাচনে অংশগ্রহণ সঠিক হবে না। কোনও নির্বাচনই সুষ্ঠু হতে দেবে না তারা।’
কেন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে যেতে চায় না ইসলামী দলগুলো? এমন প্রশ্ন ছিল ধর্মভিত্তিক কয়েকজন নেতার কাছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ‘ইসলামি দলগুলোর আর্থিক সামর্থ্য দুর্বল। ঢাকা সিটি ভোটে অংশগ্রহণ না করার এটাও একটা কারণ। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, ঢাকায় নির্বাচন করার মতো প্রার্থী না থাকা।’
জানতে চাইলে ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী বলেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণ যার যার দলীয় বিষয়। বিগত নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এ কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহ কমেছে।’
সারাদেশের স্থানীয় সরকারে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে জামায়াত। তবে আসন্ন ঢাকা সিটি ভোটে দলের কোনও প্রার্থী নেই বলে জানান জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রচার বিভাগের দায়িত্বশীল কামরুল হাসান। বৃহস্পতিবার (২ জানুয়ারি) রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াত দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে না। তবে ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি করে, তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়।’
ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ফ্রন্ট নিয়মিত স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ঢাকার সিটি ভোটের উভয় অংশে মেয়র প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন।
দলটির কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ আবদুল কাইয়ূম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ডিএনসিসিতে এবার ২৫ জন দলসমর্থিত কাউন্সিলর মনোনয়ন জমা দিলেও চার জনের ফরম বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। বাতিল হওয়া চার কাউন্সিলর প্রার্থী আপিল করেছেন। তিনি আরও জানান, ডিএসসিসিতে ১৮ জন কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়ন ফরম জমা দিয়ে প্রত্যেকেই ইসির বাছাইয়ে টিকেছেন।
ইসলামী আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, বিগত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
গত দুই-তিন বছরে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন তারা।
ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল নেতারা জানান, গত দুই-তিন বছরে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয় চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। বর্তমানে দলটির দলীয় প্রতীকে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতীক ছাড়া দলসমর্থিত চেয়ারম্যান আছেন দুজন। এরমধ্যে বরিশালের চরমোনাই ইউনিয়ন, লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার কমলাবাড়ী ইউনিয়ন, লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর থানার চরকাদিরা ইউনিয়নে দলীয় চেয়ারম্যান আছেন। আরও দুটি ইউপিতে দল সমর্থিত চেয়ারম্যান রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের প্রচার বিভাগ জানায়, গত কয়েক বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সারাদেশে এক হাজারের বেশি স্থানে নির্বাচন করেছে দলটির মনোনীত প্রার্থীরা।
নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে উঠে বলে মনে করেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ঢাকা সিটি ভোটে আমরা অংশগ্রহণ করছি। যদিও নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা— নির্বাচন কমিশন অতীতের মতো কোনও পাঁতানো নির্বাচনের আয়োজন করবে না। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে দলের নেতা কর্মীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। দলের সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটে এ কারণে আমরা নির্বাচনকে গুরুত্ব দেই।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পৌরসভা নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে ইসলামী ফ্রন্ট নিয়মিত অংশ নিচ্ছে বলে দাবি করেন দলটির মহাসচিব মাওলানা এম এ মতিন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালের পর চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী ও রাঙ্গুনিয়াতে ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী প্রার্থীরা আমাদের দলের।’ বর্তমানে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ইসলামী ফ্রন্টের একজন নির্বাচিত হয়েছেন বলেও জানান মাওলানা মতিন।
ইউপি মেম্বার অনেক আছে বলে জানিয়ে এম এ মতিন বলেন, ‘হবিগঞ্জ জেলা, চট্টগ্রাম জেলার অনেক জায়গায় ইসলামী ফ্রন্ট সমর্থিত মেম্বার আছেন।’