আমি সাংবাদিক, নারী ও মুসলিম: দিল্লি সহিংসতায় যা দেখেছিবিশ্বজমিন

প্রকাশ: ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ৩:১৭ : অপরাহ্ন

আমি যখন মৌজপুরে পৌঁছলাম, দেখলাম অনেক মানুষ ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাগরিকত্ব সংশোধন বিলের পক্ষ-বিপক্ষের লোকদের মধ্যে সংঘাতের পর উত্তরপূর্ব দিল্লির যেসব এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়েছিল, মৌজপুর তার একটি। আমাকে আগেভাগেই অন্য সাংবাদিকরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, সেখানে আমাকে কথা শোনাবে, এমনকি হেনস্থাও করতে পারে। এ কারণে আমার ফোন বের করার সাহস করি নি। আমি শুধু হেঁটেছি।

তবে হঠাৎ এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম। সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাইয়া, কী হচ্ছে এখানে?’ লোকটা লাজুক হাসি হেসে জবাব দিলেন, ‘দাঙ্গা হচ্ছে, দাঙ্গা। সবই হচ্ছে। আপনিই দেখে আসুন।’ এক পাশে দেখলাম ইট জড়ো করা হয়েছে প্রতিপক্ষকে মারতে।
আমি হাঁটতে থাকলাম।

আমার বন্ধু তারিক আমাকে নামিয়ে দিতে এসেছিল। আমরা নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নিলাম আমাদের হিন্দু নাম, পাছে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে। ‘আমি এখানেই পিজিতে থাকি’ – এই হতো আমার উত্তর। ২০০ মিটার হেঁটে আমি দেখলাম এক কোণায় বেশ বড় একটি জটলা। তারা সবাই গেরুয়া পোশাক পরা এক পন্ডিতের কথা শুনছে মনোযোগ দিয়ে। কাছে গিয়ে স্পষ্টভাবে তাকে বলতে শুনলাম, ‘মুসলমানগুলোকে যেখানে পাবে সেখানে মারো।

উপর থেকে আদেশ চলে আসছে।’ এরপরই তাড়াহুড়ো করে সে চলে গেল। কৌতুহলী হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম লোকটার সম্পর্কে। ওই ব্যক্তি জবাব দিলেন, ‘পাশের মন্দিরের পন্ডিত। আপনি কে?’ আমি বললাম, ‘আমি ওই লেনে থাকি।’ একজন বললেন, ‘চলেন আমরা পৌঁছে দিই।’ কিন্তু আমি বললাম- আমি একাই যেতে পারবো। বলেই এক লেনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদূর যেতেই আমার ফোনে কল এলো। তারিক ফোন দিয়েছে। অনেক চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে সে হারিয়েই গিয়েছিল। আমাকে ফোনে সে জানালো, ‘তুমি যে লোকগুলোর সঙ্গে একটু আগে কথা বলছিলে, তারা জিজ্ঞেস করছিলো যে তুমি কে। আমি অনেক কষ্টে এড়িয়ে গেছি। আমার মনে হয় তারা তোমাকে ফলো করছে।’ আমি কৌতুহলী হয়ে পেছনে তাকাতেই দেখি ওই একই দলের ৪ জন আমাকে অনুসরণ করছে।

মৌজপুরের কোনো এক লেনের ভেতর প্রায় ১ কিলোমিটার হেঁটেছি আমি। এদিক সেদিক ঘুরে ওই লোকগুলোকে হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। এক জায়গায় দেখলাম কয়েকজন নারী বাইরে বসে আছেন। আমি তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি দেখেই ওই লোকগুলো সম্ভবত বুঝে গেছে যে, আমি এখানে থাকি না। একজন এসে বললেন, ‘মিডিয়া থেকে এসেছেন বললেই হতো। মিথ্যা বলে আমাদের পন্ডিত সাহেবের ব্যাপারে কেন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিলেন?’ এরপর আমাদের মধ্যে ঝগড়ার মতো হয়ে গেল। লোকগুলো চিৎকার করে জানতে চাইছিল, ‘কেন আমাদের প-িত জির সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন?’ শেষে আমি মাফ চেয়ে বললাম যে, আমি এখানে এক বান্ধবীর বাসায় এসেছি। কিন্তু সে ফোন ধরছে না। ওই নারীরাই আমার পক্ষ হয়ে বললো আমাকে ছেড়ে দিতে। এরপর ওই লোকগুলো চলে গেল। চলে যেতে যেতে পর্যন্ত তারা বলছিল, ‘আমাদের প-িত জির সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন কেন? আপনি কে?’
কোনোমতে সেখান থেকে বের হলাম। ১০০ মিটার পর আরেক লোক আমাকে আমার কাছে এলেন। তিনিও একই দলের। ‘পিজিতে যাবেন? কোন পিজি? নাম বলেন। আপনার বান্ধবীর নাম বলেন।’ আমি বললাম, ‘সে আমার ফোন ধরছে না। আমি পরে আসবো। আপনি কি বলতে পারেন যে কীভাবে মেট্রো স্টেশনে যাওয়া যায়?’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও লোকটি পথ বাতলে দিলেন । আমি যত দ্রুত সম্ভব হেঁটে বের হয়ে গেলাম।

মৌজপুরের লেনের ভেতর প্রায় ৩০ মিনিট হেঁটে মূল রোডে পৌঁছলাম। লেনের ভেতরে থাকা অবস্থায় দেখেছি পুরুষরা দলে দলে লাঠি হাতে বিভিন্ন কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে সন্দেহ নিয়ে তাকাচ্ছে। তারিক আবার ফোন দিলো। বললো, ‘আমি জীবনের সবচেয়ে খারাপ জিনিসগুলো আজ দেখেছি। পেট্রোল স্টেশন জ্বলছে। টায়ার পুড়ানো হয়েছে। মানুষের দিকে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। মানুষের হাতে লাঠি আর রড। কোনো পুলিশ নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য। মানুষ যেন মারার জন্য প্রস্তুত, আর সশস্ত্র। দয়া করে এই এলাকা ছাড়ো যত তাড়াতাড়ি পারো। এটা তাদের এলাকা। যদি তারা বুঝতে পারে যে তুমি মুসলিম, তারা তোমাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যাবে। তোমার খোঁজও পাওয়া যাবে না এরপর।’ আমাকে তারিক আরও বললো আমার আইডি কার্ড ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতে।
মূল সড়কে উঠেই ২ জন লোককে দেখতে পেলাম। এসেই তারা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ক্যামেরা কই ম্যাডাম? লুকিয়ে রাখলেন নাকি?’ লেনের তুলনায় সড়ক খুব বেশি নিরাপদ মনে হলো না। দলে দলে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কপালে লাল টীকা দেয়া। হাতে বিরাট লাঠি। আরেক দল এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘জি নিউজ থেকে নাকি?’ আরেক ব্যক্তি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলো, ‘জেএনইউ (জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে নাকি?’ আমি হাসার চেষ্টা করলাম, বললাম, ‘আরেহ নাহ…।’

ততক্ষণে এটি স্পষ্ট যে মানুষ বুঝতে পারছে আমি সাংবাদিক। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। হাঁটতে থাকলাম। যাওয়ার পথে অসংখ্যবার আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে আমি কোথায় যাচ্ছি। প্রতিবার আমাকে নতুন জায়গা আবিষ্কার করতে হয়েছে। প্রথমবার যাদের সাথে দেখা হয়েছে তাদের সাথে যেন দেখা না হয় সেটাই চাইছিলাম মনে মনে। আবার দেখলে তারা বুঝে ফেলবে যে আমি শুধু সাংবাদিক হওয়া নিয়েই মিথ্যা বলিনি, আমি মুসলিমও। আমি পথ বোঝার চেষ্টা করছি। তখনই একদল আমাকে থামালো। রুক্ষ্ম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কোথায় যেতে চান?’ আমি দ্রুতই বললাম যে, গুরগাঁও। এই স্থানের কথা মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম। এক লোক বললো, ‘আপনি লেনের ভেতর দিয়ে ওই পাশে গিয়ে মেট্রোতে উঠে যান। এরপর অটো পাবেন। নিয়ে নেবেন।’ আমি হাঁটতে ধরলাম, তখন আরেক লোক বললো, আপনি মূল সড়ক দিয়ে যান। সেটাই বেশি নিরাপদ। আমি বললাম, মূল সড়ক অনেক ভয়ানক। অনেক মারামারি হচ্ছে।

তখন সে বললো, ‘আসল মারপিঠ তো হবে মোহামেডান (মুসলিম) এলাকায়। সামনে মোহামেডান এলাকা। আপনি যদি ভেতর দিয়ে যান, যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে।’ আমাকে হিন্দু ভেবে তিনি আরও বললেন, ‘মূল সড়কে ভয় কিসের? মুসলিম হলে ভয় পাওয়া উচিত। মূল সড়কের সবাই আমাদের লোক।’ মুসলিম লোকজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমি তাকে বললাম যে, মূল সড়ক দিয়ে আমি সত্যিই যেতে চাই না। এরপর মুসলিম কলোনির ভেতর হাঁটা শুরু করলাম। ৫ মিনিট ভেতরে হেঁটেই দেখলাম পুরুষরা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে। অনেকটা যেন নিজের ঘর পাহারা দিচ্ছে। মাত্র নামাজ শেষ করে আসা ফিরোজ নামে এক যুবক বললেন, ‘আমাদের জন্য সব থেমে গেছে। মূল সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা কই যাবো? এখন একমাত্র যে জায়গায় আমরা নিরাপদ বোধ করছি সেটা হলো আমাদের বাড়ি। রাস্তাঘাট খুব অনিরাপদ। আমরা জন্মের পর থেকে এখানে বসবাস করছি। এই প্রথম এই ধরণের কিছু ঘটলো। আমাদের পরিবারের মেয়েদের নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত।’ আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি বললেন, এই জায়গা থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরে যান। তার ভাষ্য, ‘পুলিশ কিছুই করছে না। তারা এখানে নেইও। তারা যদি এখানে থাকতো কেউ মুসলিমদের দোকানপাট জ্বালাতো না।’

আমি এরপর এলাকা ছেড়ে গেলাম। আমি সেখানেই গিয়ে পড়লাম যেখান থেকে শুরু করেছি। কিন্তু ভাগ্যবশত, ওই দলের সাথে আর দেখা হয়নি।
আমি আরেকটি জটলা দেখতে পেলাম। সড়কের আরেক পাশে। আমি তাড়াতাড়ি দৌড়ে গেলাম কী হচ্ছে দেখতে। দেখলাম অন্তত জনা ত্রিশেক নারী, কপালে গেরুয়া টীকা, নাজির হোটেলের সামনে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের উপরের বারান্দা থেকে লোকজন ওই মহিলাদের দেখছে। তাদের একজন উপরের লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানে ঘরের ভেতর কোনো মুসলমান নেই তো?’ এরপর আরেকজন বললেন, ‘ঘর থেকে মুসলমানদের বের করো। যদি কোনো হিন্দু নিজের ঘরে মুসলমানকে আশ্রয় দিয়ে থাকে, তাহলে তাকেও ছাড়া হবে না। তার ঘরও জ্বালিয়ে দেব। হিন্দু ঘর কিনা, দেখবো না।’ এরপর ওই মহিলারা সেই ঘরের দিকে ইট ছুড়তে লাগলো।
আমি সেখানে ৩ ঘণ্টা ছিলাম। কোনো পুলিশের লোক দেখলাম না। দুইবার পুলিশের গাড়ি সেখানে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়ে ওই জটলার লোকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়েছে। আমি বুঝিনি কী উদ্দেশ্যে। আমি একটি দোকানের সিঁড়িতে কিছুক্ষণ বসে ছিলাম। ৪ জন লোক আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের একজন এসে বললো, এখানে বসে আছেন কেন? চলে যান এখান থেকে।

এরপর চলে গেলাম। কেউ যদি আইডি কার্ড দেখতে চায়, তাহলে আমি শেষ। সৌভাগ্য বলতে হবে, কিছুক্ষণ পর আমি রিপাবলিক টিভির এক সাংবাদিককে দেখলাম গাড়িতে করে যেতে। তাকে বললাম আমাকে এগিয়ে দিতে। সে আমাকে নিলো। আর বের হতে পারলাম সেখান থেকে।
গত রাতেই খাজুরি খাস এলাকায় বাস করে এক বন্ধু আমাকে ফোন করে বললো, ওই এলাকায় কীসের শ্লোগান দেওয়া হচ্ছে শুনতে। আমি শুনলাম, অনবরত ‘জয় শ্রীরাম!’ শ্লোগান।

আমি শুনেছি স্থানীয়দের আইডি কার্ড দেখতে চাচ্ছে একদল লোকজন। দেখলাম এক লোকের অটো গাড়ি ভেঙ্গে দেওয়া হচ্ছে। এক বন্ধু জানালো যে, ওই লোক মুসলিম ছিল। তার পরিচয়পত্র দেখার পর তার গাড়ি ভেঙ্গে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাস্তা ব্লক করে যারা ছিল তাদের হাতে ইট, ব্যাট, লাঠি, রড ও কুড়াল। মৌজপুরের সড়কে কোনো পুলিশ বা আধাসামরিক বাহিনী ছিল না। ছিল উত্তেজিত লোকজন। আমি আতঙ্কে ছিলাম, আমার পরিচয় জানলে তারা হয়তো সাংবাদিক হওয়ায় আমাকে হেনস্থা করবে, নারী হওয়ায় শ্লীলতাহানি করবে, মুসলমান হওয়ায় আমাকে পেটাবে।

(ইসমত আরা একজন ভারতীয় সাংবাদিক। তার এই নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ফার্স্টপোস্ট-এ।)